অগ্রযাত্রায় সহযাত্রী থাকবে ভারত-নরেন্দ্র মোদি

অগ্রযাত্রায় সহযাত্রী থাকবে ভারত-নরেন্দ্র মোদি
অগ্রযাত্রায় সহযাত্রী থাকবে ভারত-নরেন্দ্র মোদি

চাঁদপুর সময় রিপোট-যে কোনো সময়ের থেকে বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্কের সোনালি অধ্যায় চলছে। যুদ্ধবন্ধু ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফরে এসে অগ্রযাত্রায় একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে গেছেন। বলেছেন, দুই দেশ ঐতিহ্যের অংশীদার, উন্নয়নেরও অংশীদার। ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ সোনার বাংলা বিনির্মাণে বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এবং সহযোগিতার এ পথচলা অব্যাহত রাখবে ভারত।

সফরের দ্বিতীয় দিনে গত ২৭ মার্চ গত পাঁচ দশকে দুই দেশের সম্পর্কের মূল্যায়ন করে ভবিষ্যতের পথনকশা কেমন হবে, সেটা ঠিক করতে শীর্ষ বৈঠকে বসেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদি। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বহুমাত্রিক ও বিস্তৃত পরিসরে দুপক্ষের মধ্যে অত্যন্ত অর্থবহ ও বিস্তৃত পরিসরে আলোচনা হয়। সম্পর্ক জোরদারে শীর্ষ বৈঠকের পর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য, তথ্যপ্রযুক্তি ও খেলাধুলাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পাঁচটি সমঝোতা স্মারক সই করেছে বাংলাদেশ ও ভারত।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ওই দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর দুই নেতা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সাতটি উন্নয়ন প্রকল্পেরও উদ্বোধন করেন। যে ৫ বিষয়ে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে সেগুলো হলো- দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, অভিযোজন ও প্রশমনের ক্ষেত্রে সহযোগিতা, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি) এবং ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর অব ইন্ডিয়ার (আইএনসিসি) মধ্যে সহযোগিতা, বাণিজ্য বিকাশে অশুল্ক বাধা দূর করতে একটি সহযোগিতা ফ্রেমওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা, বাংলাদেশ-ভারত ডিজিটাল সার্ভিস অ্যান্ড এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড ট্রেনিং (বিজিএসটি) সেন্টারের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি সরঞ্জাম, কোর্সওয়্যার ও রেফারেন্স বই সরবরাহ এবং প্রশিক্ষণ সহযোগিতা ও রাজশাহী কলেজ মাঠের উন্নয়নে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন। এ ছাড়া শিলাইদহের সংস্কারকৃত কুঠিবাড়ি, মেহেরপুরের মুজিবনগর থেকে পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া হয়ে কলকাতা পর্যন্ত স্বাধীনতা সড়ক, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় শহীদদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিসমাধি, ভারতের উপহার ১০৯টি অ্যাম্বুলেন্স, চিলাহাটি-হলদিবাড়ী রুটে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল, দুটি সীমান্ত হাট উদ্বোধন এবং স্মারক ডাকটিকিটের মোড়ক উন্মোচন করা হয়।

কানেক্টেভিটি : দুই দেশের শীর্ষ বৈঠকে বাংলাদেশ কানেক্টেভিটির ওপর জোর দেয়। নেপাল ও ভুটানের পাশাপাশি সড়কপথে থাইল্যান্ডের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ তৈরিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সহযোগিতা চান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিবিআইএন মোটর ভেহিকেলস অ্যাগ্রিমেন্ট বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের মধ্যে ‘ত্রিদেশীয় এনাবলিং এমওইউ’ দ্রুত স্বাক্ষরের বিষয়ে দুই নেতা বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। ভারতীয় ভূখ- ব্যবহার করে নেপাল ও ভুটানে আরও বৃহত্তর পরিসরে অভিগম্যতা চায় বাংলাদেশ। এ জন্য বাংলাদেশ নতুন কিছু রুট অনুমোদনের জন্য ভারতকে অনুরোধ জানায়। ভারত, মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের মধ্যে ‘ত্রিপক্ষীয় মহাসড়ক’ প্রকল্পে যুক্ত হতে বাংলাদেশের আগ্রহের কথাও ভারতকে জানানো হয়। একইসঙ্গে সম্প্রতি উদ্বোধন হওয়া ‘চিলাহাটি-হলদিবাড়ী রেল রুট’ ব্যবহার করে ভুটানের সঙ্গে রেল কানেক্টিভিটি তৈরিতে বাংলাদেশের আগ্রহের কথাও ভারতকে জানানো হয়েছে। বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বলিষ্ঠ আঞ্চলিক কানেক্টিভিটির প্রয়োজনীয়তার ওপরও দুই সরকারপ্রধানই জোর দিয়েছেন।

জ্বালানি ও নিরাপত্তা : এ ক্ষেত্রে দুদেশের মধ্যে বিদ্যমান সহযোগিতা, বিশেষ করে নেপাল ও ভুটানকে সঙ্গে নিয়ে উপআঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। ভারতের ঋণচুক্তির (এলওসি) আওতাধীন প্রকল্পগুলোকে আরও বেগবান করার ব্যাপারেও দুই প্রধানমন্ত্রী আলোচনা করেছেন। এ বিষয়ে গঠিত উচ্চ পর্যায়ের কমিটিকে তারা প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা বিধানে বাংলাদেশের অকুণ্ঠ সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ জানায় ভারত। সীমান্তে একজন বাংলাদেশিও যেন কোনো কারণে বিএসএফের হাতে নিহত না হন, সেটি নিশ্চিত করার জোরালো দাবি উত্থাপন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সীমান্তে শান্তি, সম্প্রীতি ও স্থিতাবস্থা বজায় রাখার লক্ষ্যে সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার (সিবিএমপি) আওতায় বিজিবি ও বিএসএফকে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করে যাওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন দুই প্রধানমন্ত্রী।

রোহিঙ্গা ইস্যু ও তিস্তা চুক্তি: এই ইস্যুতে ভারত বাংলাদেশের অবস্থানকে সমর্থন জানিয়েছে। এ ছাড়া তিস্তাসহ যৌথ নদীর পানির ন্যায্য হিস্যার ওপর বাংলাদেশের অলঙ্ঘনীয় অধিকারের বিষয়টি বরাবরের মতোই জোরালোভাবে উত্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি তিস্তার পানি বণ্টনের ‘অন্তর্বর্তী চুক্তি’ দ্রুত সম্পাদনের জোর দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি চূড়ান্ত করা হবে বলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আশ্বাস দেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

এসব ইস্যু ছাড়াও দুই দেশই কোভিড-১৯ মোকাবিলায় যুদ্ধ করছে জানিয়ে নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশকে ১২ লাখ টিকা এবং ১০৯টি লাইফ সাপোর্ট অ্যাম্বুলেন্স দেওয়ার কথাও বৈঠকে তুলে ধরেন। দুই দেশের উদ্যোক্তাদের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে যা কিছু শ্রেষ্ঠ দুই দেশ সেগুলোর একটি প্রদর্শনীর আয়োজনের প্রস্তাব দেন মোদি। ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এবং জলপাইগুড়ির মধ্যে যাত্রীবাহী ট্রেন দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ বাড়াবে জানিয়ে আগরতলা ও আখাউড়া ট্রেন লাইনের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি। একই সঙ্গে মোদি জ্বালানি ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতার বিষয়টি তুলে ধরেন। বাংলাদেশ ভারতের সহযোগিতায় যেসব প্রকল্প হচ্ছে, সেগুলোর বাস্তবায়নের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

দুই দেশের সম্পর্কের ব্যাপারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আব্দুল মোমেন বলেন, চিরায়ত সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিক নৈকট্য এবং ঐতিহাসিক মেলবন্ধনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ-ভারত বহুমুখী অংশীদারিত্ব বিগত অর্ধশতাব্দী ধরে বিবর্তিত, বিকশিত ও সমৃদ্ধ হয়েছে। দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মডেল হিসেবে বিবেচ্য আমাদের এই অকৃত্রিম বন্ধুত্বকে অনবদ্য দ্যোতনা প্রদান করেছে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর এই সফর।

নরেন্দ্র মোদিও সফর ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক তারেক শামসুর রেহমান বলেন, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরে এখানকার মানুষের আশা শতভাগ পূরণ হয়েছে সেটি বলা যাবে না। তবে অনেক প্রাপ্তিও আছে। তিস্তা চুক্তিতে জোরালো প্রতিশ্রুতি আবারও ব্যক্ত করেছের মোদি, তবে স্পষ্ট দিনক্ষণ ঘোষণা করেননি। তার এবারের সফরের মাধ্যমে প্রমাণ হলো বাংলাদেশকে ভারত গুরুত্ব দেয়। গত ১৫ মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বিদেশ সফর করেননি। বাংলাদেশেই প্রথম এলেন। এখানেই বাংলাদেশের গুরুত্বটা বোঝা যায়।চা

Leave a Reply

Your email address will not be published.