আকারে ছোট হয়ে আসছে চাঁদপুরের ইলিশ

ক্রমেই আকারে ছোট হয়ে আসছে দেশের নদীতে ধরা পড়া ইলিশ। ছোট হচ্ছে মাছের ডিম্বাশয়ের আকারও। এতে কমছে ডিমের পরিমাণ। ছোট আকৃতির মাছের ডিম থেকে জন্ম নেওয়া ইলিশও হচ্ছে খর্বাকৃতির। এর মধ্যে আবার অনেক মাছ ডিম দিচ্ছে অল্প বয়সে। সেই ডিম থেকে জন্ম নেওয়া ইলিশও হচ্ছে আকারে ছোট।

গবেষকরা বলছেন, পরিবেশ ও জিনগত কারণে ইলিশের এই পরিস্থিতি। গবেষণার মাধ্যমে এর সমাধানে পৌঁছানো গেছে।

ইলিশ গবেষণা জোরদারকরণ প্রকল্পের তথ্য বলছে, দেশের নদ-নদী ও সাগরে ইলিশের বার্ষিক সর্বোচ্চ সহনশীল উৎপাদন অর্থাৎ আহরণ মাত্রা ৭ লাখ ৭০৫ মেট্রিক টন। এর চেয়ে বেশি মাছ আহরণ হলে ইলিশের প্রাকৃতিক মজুত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে ভবিষ্যতে ইলিশ উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

গবেষণা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মেঘনা থেকে একটি ইলিশ অভিপ্রায়ণ (দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে চলা) করে যাচ্ছে সাগরে। সাগর থেকে আবার ফিরে আসছে মেঘনায়। আবার পদ্মা থেকে কোনো মাছ সাগরে গেলে পদ্মায়ই ফিরে আসছে। কিন্তু সব মাছ তো যেতে পারছে না। নদীগুলোতে পলি জমে সৃষ্টি হয়েছে নাব্য সংকট। ফলে ইলিশ পরিপূর্ণ অভিপ্রায়ণ করতে পারছে না। এজন্য মেঘনার মাছ মেঘনায়ই বসবাসের জন্য একটি সার্কেল তৈরি করবে। স্বাভাবিকভাবেই পরিপূর্ণ বয়সে ডিম পাড়বে মাছটি। এক্ষেত্রে অভিপ্রায়ণ করে ডিম পাড়া একরকম, আর একই জায়গায় অবস্থান করে ডিম পাড়লে ভিন্ন হবে। এছাড়া যথাযথ খাবার না পাওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে ইলিশের সঠিক বৃদ্ধি।

গবেষকদের মতে, প্রথম যৌনতার জন্য ইলিশ পরিপক্ব হয় ২৬ সেন্টিমিটারে অথবা এক বছর দুই মাস বয়সে। পুরুষ ও স্ত্রী ইলিশের সাইজ আনুমানিক ৩৩ সেন্টিমিটার হলে পরিপক্ব হয়, যখন তাদের বয়স হয় এক বছর। এসময় পুরুষ-স্ত্রী উভয়ই ইলিশ প্রজনন উপযোগী হয়। ইলিশের সর্বোচ্চ প্রজনন মৌসুম হচ্ছে অক্টোবর-নভেম্বর ও ফেব্রুয়ারি-মার্চ।

গবেষকরা বলছেন, দেশে ইলিশ ব্যবস্থাপনা কৌশল সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হওয়ায় অতি আহরণ সত্ত্বেও ক্রমশ উৎপাদন বাড়ছে ইলিশের।

চাঁদপুর নদী কেন্দ্রে ইলিশ গবেষণা জোরদারকরণ প্রকল্পের পরিচালক মো. আবুল বাশার বলেন, ইলিশের আকারের ক্ষেত্রে দুটি জিনিস দেখা হয়। এর মধ্যে একটি কত গ্রাম ওজনে ইলিশের যৌন পরিপক্বতা আসে, আরেকটি কত বছরে যৌন পরিপক্বতা আসে। মূলত ইলিশের যৌন পরিপক্বতা আসে ২৬ সেন্টিমিটার অথবা এক বছর দুই মাসে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে এই সময়ের মধ্যে ইলিশ যেমন বড় হওয়ার কথা তেমন বড় হচ্ছে না। ছোট আকৃতির থাকছে, মানে খর্বাকৃতির। এ ধরনের ইলিশের সংখ্যা আমাদের কাছে বেশি মনে হচ্ছে। এটি বেশি হলে এক ধরনের সমস্যা তৈরি হয়। যেমন- বড় আকৃতির ইলিশ তার থলিতে যে পরিমাণ ডিম ধারণ করতে পারে, ছোট আকৃতির এই মাছ সেই পরিমাণ ডিম রাখতে পারে না। এই অবস্থা চলতে থাকলে স্বাভাবিকভাবেই ইলিশের বিস্তারে প্রভাব পড়বে।

ইলিশ ছোট হওয়ার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ইলিশ খর্বাকৃতি হওয়ার জন্য একটি কারণ হলো তাপমাত্রা, আরেকটি জিনগত পরিবর্তন। সমাধানের ক্ষেত্রে বলা হচ্ছে, মাছটি যখন মাইগ্রেশন করে সেই পথ যেন ক্লিয়ার থাকে। যে মাছ ডিম পাড়তে নদীতে আসবে সেটি যেন ডিম পেড়ে ফের সমুদ্রে যেতে পারে। এক্ষেত্রে যেন কোনো বাধা না পায়। এমনটি হলে স্বাভাবিক বৃদ্ধি ঠিক থাকবে ইলিশের।

মো. আবুল বাশার আরও বলেন, আমাদের জালের ফাঁস সাড়ে পাঁচ সেন্টিমিটার ছিল, সেটি বাড়িয়ে সাড়ে ছয় সেন্টিমিটার করেছি। এতে এখন ২৫ শতাংশ বাড়তি বড় আকারের (৮০০-১০০০ গ্রাম) ইলিশ ধরা পড়ছে। এছাড়া আমাদের প্রকল্পের তিনটি উদ্দেশ্যের সবগুলোই বাস্তবায়ন হয়েছে। গবেষণা একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এটি কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমায় শেষ করা সম্ভব নয়। তবে যে সূচনাটি হয়েছে সেটি নিয়ে আশাবাদী আমরা।

২০১৮ সাল থেকে কাজ করছে ইলিশ গবেষণা জোরদারকরণ প্রকল্প। এতে ব্যয় হচ্ছে সাড়ে ৩৩ কোটি টাকা। চলতি মাসে (জুন) শেষ হবে এর মেয়াদ। গত পাঁচ বছরে প্রকল্পের আওতায় জেলেদের প্রশিক্ষণ, সচেতনতা তৈরি, অভয়াশ্রম নির্ণয়, ছোট ইলিশের পেটে ডিম আসার কারণ নিরূপণ, ইলিশের বিচরণক্ষেত্র পরিবর্তনের কারণ নির্ণয়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, ইলিশের সুষ্ঠু বাজারজাতকরণ ও মূল্য নির্ধারণ, ডিম-রেণুর সঠিক পরিসংখ্যান নির্ণয় ও মজুত, ইলিশ গবেষণাগারের পরিমার্জন ও সংস্করণ, অবকাঠামো তৈরি এবং বেশকিছু গবেষণার ফল প্রকাশসহ নানা বিষয়ে কাজ হয়।

তবে এই প্রকল্পের কার্যক্রমের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বিভিন্ন আকারের ইলিশের বয়স নির্ধারণ, ডিম ছাড়ার মৌসুমে ইলিশের গনাডো-সোমাটিকসূচক (জিএসআই) মূল্যায়ন, হিটোলজি পদ্ধতির মাধ্যমে ডিমের কোষ বিশ্লেষণ করে ডিম্বাশয়ের পরিপক্বতা স্তর নির্ধারণ, পিসিআর পদ্ধতি ব্যবহার করে ডিম্বাশয়ের পরিপক্বতার জন্য দায়ী জিনের গুণগত এবং পরিমাণগত অভিব্যক্তি স্তর নির্ধারণ।

এ গবেষণায় মেঘনা, তেঁতুলিয়া ও পদ্মা নদী এবং বঙ্গোপসাগরের নমুনায় ডিম্বাশয়ের পরিপক্বতায় ইলিশের বয়স-আকারের সঙ্গে একরৈখিক পাওয়া গেছে। কিন্তু কালী নদী, কিশোরগঞ্জ ও গাগলাজুর হাওর, নেত্রকোনার ইলিশের নমুনা পাওয়া গেছে পরিপক্ব ডিম্বাশয় এবং আকারে ছোট।

এমভি বিএফআরআই গবেষণা তরী
এদিকে ইলিশ গবেষণার জন্য নতুন জাহাজ সংযোজন করেছে মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই)। এর নাম ‘এমভি বিএফআরআই গবেষণা তরী’। চলতি বছরের (২০২২ সাল) জানুয়ারি থেকে এ জাহাজ ঘুরে বেড়াচ্ছে জলরাশিতে। সেখানে গবেষণার মাধ্যমে নেওয়া হচ্ছে নতুন নতুন পদক্ষেপ।

এই ফিশারিজ ভেসেলের দৈর্ঘ্য ২৫ মিটার, প্রস্থ ৬ মিটার, গভীরতা ২ দশমিক ৮০ মিটার, ড্রাফট ১ দশমিক ৪০ মিটার, ডিসপ্লেসমেন্ট ৯০ মেট্রিক টন, সর্বোচ্চ গতি ১০ নটিক্যাল মাইল, জাহাজটির হাল ম্যাটেরিয়াল-স্টিল এবং অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি।

এর ভেতরে একটি অত্যাধুনিক ইলিশ গবেষণা ল্যাবরেটরি রয়েছে। জাহাজে ছয়জন বৈজ্ঞানিকসহ মোট ১৮ জন ক্রু অবস্থান করতে পারেন। গবেষণার জন্য নদীতে ১৫ দিন অবস্থান করতে পারে জাহাজটি।

ধারণা করা হয় ইলিশের তিনটি মজুত রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বঙ্গোপসাগরের অগ্রভাগে অবস্থিত একটি মজুত যা প্রজননের সময় উজানে অভিপ্রায়ণ করে। আর নদীতে অবস্থিত একটি মজুত, যা জীবনচক্রের পুরোটাই অতিবাহিত করে নদীতে, কখনো অভিপ্রায়ণ করে না। অন্যটি হলো সমুদ্রে অবস্থিত ইলিশের মজুত, যা জীবনচক্রের পুরোটাই সমুদ্রে অতিবাহিত করে, কখনো অভিপ্রায়ণ করে না।

তবে জেনেটিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে ইলিশের দুটি মজুত নিরূপণ করা হয়, সামুদ্রিক ও নদীর। এর মধ্যে আবার মরফোমেট্রিক (মাছের বৈশিষ্ট্য পরিমাপ) ও জেনেটিক অ্যানালাইসিসের মাধ্যমে বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমারের সমুদ্রসীমায় ইলিশের আরেকটি অভিন্ন মজুত পাওয়া গেছে।

ইলিশের ভবিষ্যৎ গবেষণা পরিকল্পনা
ইলিশের উৎপাদন বাড়ানো ও এর চাহিদা মেটাতে সামনে আরও বেশকিছু গবেষণা করবে সরকার। এর মধ্যে রয়েছে ইলিশের পরিভ্রমণপথ নির্ণয় ও নাব্য সংকট নিরসনে গবেষণা, ইলিশের প্রজনন এবং বিচরণক্ষেত্র চিহ্নিত করে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল জিপিএস ম্যাপ প্রণয়ন করা।

আরও রয়েছে নতুন প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র শনাক্ত করা, ইলিশ উৎপাদনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নির্ণয়, ইলিশ উৎপাদনে নদীদূষণের প্রভাব নির্ণয়, প্রবেশনের ধারা পরীক্ষা করা, বঙ্গোপসাগর এবং দেশের নদ-নদীতে ইলিশের মজুত নিরূপণ। মেঘনায় ইলিশ-জাটকার বহন ক্ষমতা নির্ণয়, গভীর সাগরে ইলিশ নিয়ে গবেষণা এবং ইলিশ নিয়ে আন্তঃদেশীয় ইকোলজিকাল স্ট্যাডি করা।

ইলিশের বর্তমান অবস্থা নিয়ে কথা হয় ড. আনিছুর রহমানের সঙ্গে। তিনি মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের চাঁদপুর নদী কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ছিলেন। বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন ময়মনসিংহে মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) হিসেবে।

এই গবেষক বলেন, ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে ইলিশের আবাসস্থল। এটি পরিবেশ বা পানিদূষণের কারণেও হতে পারে। কারণ ইলিশের পেটে পাওয়া গেছে প্রায় ৩৬ শতাংশ বালু-কাদা। এতেই বোঝা যায় পানিতে বালি ও কাদা রয়েছে। এটা তো তাদের খাবার নয়। তারা পানি ফিল্টার করে খায়। কিন্তু পানিতে বালু-কাদা আছে বলেই তাদের পেটে তা চলে যাচ্ছে। এরপর কিন্তু সেটি হজম হচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, অল্প বয়সেই মাছ ডিম দিচ্ছে। এটা কিন্তু খারাপ বিষয়। কারণ এই মাছ যখন বাচ্চা দেবে, স্বাভাবিক কারণেই সেটি ম্যাচিউরড বা পরিণত হবে না। আমাদের ইলিশ গবেষণা প্রকল্পের মাধ্যমে সরকারকে পরামর্শ দিয়েছি আগামী দু-তিন বছর সর্বোচ্চ সাত লাখ টন পর্যন্ত ইলিশ আহরণ করতে। এর বেশি করলে প্রাকৃতিক যে মজুত আছে সেটার ওপর প্রভাব পড়বে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *