আত্মসম্মান কাতর মধ্যবিত্ত ও তরুণশ্রেণির প্রতি নজর দিন

মধ্যবিত্ত বলতে আমরা আসলে বুঝি যারা দারিদ্র্য রেখার ওপর আছে। আয়ের দিক আমাদের প্রেক্ষাপটে যেসব পরিবারের আয় ৪০ থেকে ৮০ হাজারের মধ্যে, তাদের আমরা মধ্যবিত্ত বলতে পারি। এই হিসাবে কোভিড পরিস্থিতির আগে বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত প্রায় ৩০ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল।

মধ্যবিত্তের যেমন আত্মসম্মানবোধ প্রবল, বিপদে পড়লেও কারো কাছ থেকে দয়াদাক্ষিণ্য নেয় না, একইভাবে এই ক্যাটাগরিতে থাকা দেশগুলোর জন্য স্বল্প সুদের ঋণসহ অনুদানের সুযোগ সুবিধাগুলো নেই, যেমনটা আছে নিম্ন আয়ের দেশের জন্য।
এছাড়া করোনাকালে দীর্ঘসময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় বন্ধ হয়ে গেছে লজিং-টিউশন ও পার্টটাইম জব। এসময়ে ম্যাচগুলোও বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তরুণদের অনেকেই শহর থেকে গ্রামে নিজ পরিবারের কাছে ফিরেছেন।

কিন্তু এখন আবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্বল্প পরিসরে খুললেও টিউশন বা পার্টটাইম জবগুলো আর সে অর্থে চালু হয়নি। ফলে তরুণ বয়সী ছাত্রদের বড় একটি অংশ বেকারত্বের ঘানি টানতে হচ্ছে।

আর্থিক ও সামাজিক সামর্থের বিচারে দেশগুলোকে স্বল্পোনন্নত, উন্নয়নশীল ও উন্নত এই তিন ভাগে ভাগ করে জাতিসংঘ। বাংলাদেশ আছে সবচেয়ে নিচে, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকাতে। যদিও সেখান থেকে উত্তরণে যে শর্তগুলো রয়েছে সরকারের হিসেবে দুই বছর আগেই সেগুলো পূরণ হয়েছে। এতে করে স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাছ থেকে এখন যেই সুবিধাগুলো মিলছে, সেগুলো আর আগের মতো পাওয়া যাচ্ছে না।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশকে এখন বড়সড় একান্নবর্তী মধ্যবিত্ত এক পরিবারের সঙ্গেই তুলনা করা চলে। পরিবারের সবার আর্থিক স্বচ্ছলতা যে একরকম, তা নয়। বেশিরভাগের অবস্থাই টানাটানির। তার মধ্যেই দু-একজন, আলাদিনের চেরাগের বদৌলতে অবাক করা সম্পত্তির মালিক হয়ে উঠেছেন। তাদের হাতেই সমস্ত কিছুর নিয়ন্ত্রণ। সব সুযোগ সুবিধাও তারা নিজেরাই ভোগ করতে চান, বাকিদের প্রাপ্যটা নিয়েও টানাটানি করেন।

পরিবারের কর্তৃত্ব যার হাতে, তিনিও সমস্ত কিছুতে তাদের পক্ষেই অবস্থান নেন, সিদ্ধান্ত দেন। সদস্যদের যাদের অবস্থা একেবারে নিচে তারা মাঝেমধ্যে প্রতিবাদ করেন, কিছুটা প্রাপ্য আদায় করে নেন। মাঝখানে যারা আছেন তাদের তেমন কোন উচ্চবাচ্য নেই। খারাপ বা ভাল যাই থাকেন না কেন, বাইরে বেশ পরিপাটি এক ভাব নিয়ে চলেন। তাই তাদের প্রকৃত অবস্থা বোঝাটা মুশকিল।

আগে মাঝে মধ্যে কোনো অন্যায়ের প্রতিবাদ করতেন এখন তা-ও করেন না, সবার সঙ্গে আপোষ করে চলেন। কখনো কখনো পরিবারে যে তাদের অস্তিত্ব আছে তা টেরই পাওয়া যায় না।

একটি জরিপের ফল বলছে, করোনা মহামারির প্রভাবে চরম দারিদ্র্যের হার বেড়েছে কয়েক শতাংশ। করোনার প্রভাবে ১৭.৩ শতাংশ পরিবার আগের মতো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে পারছে। ৫৫.৯ শতাংশ পরিবারের কাজ থাকা সত্ত্বেও আয় কমেছে। ৮.৬ শতাংশ পরিবার কাজ হারানোর কথা বলেছে। ৭ শতাংশ পরিবারের কাজের সময় কমেছে। আর ৩৩.২ শতাংশ পরিবার বলেছে, তারা আবার কাজে ফিরেছে।

অ্যাকশন এইডের একটি জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনা মহামারির কারণে দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আত্মনির্ভরশীল কিংবা নিজেই ব্যবসা পরিচালনা করে এমন প্রায় ৭৯.৭ শতাংশ তরুণের মাসিক আয় কমেছে। আর বেতনভুক্ত ৫৭.৪ শতাংশ তরুণের আয় কমে গেছে।

কাজী মোহাম্মদ ইব্রাহীম জুয়েল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *