কলঙ্কমোচনের বড় অধ্যায়

কলঙ্কমোচনের বড় অধ্যায়
কলঙ্কমোচনের বড় অধ্যায়

চাঁদপুর সময় রিপোট-স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী বাঙালি জাতির জীবনে এক মহাআনন্দের ক্ষণ। ৫০ বছর আগে বাঙালির যে নিজস্ব মানচিত্র অর্জন, তার পেছনে তেজোদ্দীপ্ত সংগ্রামের সঙ্গে রয়েছে অপরিসীম ত্যাগ-তিতিক্ষার এক করুণ ইতিহাস। রাজাকার, আলবদর, আলশামসসহ স্বাধীনতাবিরোধী এদেশীয় দোসরদের সহযোগিতায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী মুক্তিযুদ্ধকালে গণহত্যা, হত্যা, ধর্ষণ, গণধর্ষণসহ নির্মম অত্যাচার চালায়। স্বাধীনতার উষালগ্নে দেশের সূর্যসন্তান বুদ্ধিজীবীদের খুঁজে খুঁজে হত্যা করে। এ দেশের মেরুদ- চিরতরে ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করে। ঘাতকদের হাতে যুদ্ধকালীন ৯ মাসে শহীদ হন ৩০ লাখ। ধর্ষণের শিকার হন প্রায় পাঁচ লাখ মা-বোন; দেশত্যাগে বাধ্য হন এক কোটি মানুষ। এত অল্প সময়ে এমন বীভৎস ও নির্মম অত্যাচার পৃথিবীর অন্য কোথাও বিরল। এমন নির্মমতার পরও যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধী অপরাধীরা থেকে গিয়েছিল বিচারের বাইরে। বরং এদেশীয় শীর্ষ অপরাধীদের রাষ্ট্রক্ষমতায় বসানো হয়েছিল। ২০১০ সালে গভীর এ ক্ষত প্রশমনের উদ্যোগ নেয় আওয়ামী লীগ সরকার। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত এদেশীয় ঘাতকদের বিচার শুরু হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্বাধীনতার ৫০ বছরের মধ্যে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার বাংলাদেশের আরেকটি বড় অর্জন। এই বিচারের মধ্য দিয়ে কিছুটা হলেও জাতি কলঙ্কমুক্ত হওয়ার পথে। বিদেশিদের চাপ, রাজনৈতিক মতানৈক্যসহ অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে যুদ্ধাপরাধের বিচার এখনো চলছে। দেশের মাটিতে সব যুদ্ধাপরাধীর বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই বিচার অব্যাহত রাখার দাবি উঠেছে। ইতিহাসবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন বলেন, যুদ্ধাপরাধের বিচারের চেয়ে বড় অর্জন আর হয় না। এই একটি কারণেই বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নাম ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তিনিই একমাত্র সাহসী মানুষ, যিনি এই বিচারকাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই উপমহাদেশের অন্য কোনো নেতা আর এ ধরনের সাহস দেখাতে পারেননি। তিনি আরও বলেন, ট্রাইব্যুনালের বিচার কার্যক্রম আরও জোরদার হোক। মনে হচ্ছে এর গুরুত্ব কমে গেছে; কিন্তু যেভাবেই হোক, এই যুদ্ধাপরাধের বিচার চলমান রাখতে হবে। দেশে জঙ্গিবাদ ও মামুনুল হকদের মতো আর কারও উত্থান যাতে না হয়, সে জন্যই এটি চলমান রাখা প্রয়োজন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার প্রধান সমন্বয়ক এম সানাউল হক আমাদের সময়কে বলেন, স্বাধীনতার ৪০ বছর পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হয়। এক সময় যারা পতাকা নিয়ে ঘুরে বেড়াতো, তারা তো ধারণাই করতে পারেনি যে, বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। সেই ধারণা ভেঙে গেছে, জনগণের পূর্ণ সমর্থনে আমরা শীর্ষ রাজাকারদের বিচার সম্পন্ন করতে পেরেছি। এটা আমাদের অনেক বড় প্রাপ্তি।

বিচারের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘পৃথিবীর কোনো দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকালে সংগঠিত প্রতিরোধ দেখা যায়নি। আমাদের দেশে বড় দুটি রাজনৈতিক দল এই বিচারের প্রকাশ্যে বিরোধিতা করে হরতালসহ ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি দিয়েছে।

এর পরও কিন্তু আমাদের মামলার প্রাণ (সাক্ষী) কিন্তু সাক্ষ্য দিতে এসেছেন। অনেক জায়গায় সাক্ষীদের ভয়, প্রলোভন দেখানো হয়েছে। অনেক ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়েছে। এ দেশের জনগণ, প্রশাসন, বুদ্ধিজীবী ও মিডিয়ার সহযোগিতায় সেসব বাধা কাটিয়ে বিচারকাজ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে।

ফাঁসি কার্যকর হয়েছে যাদের

দুটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধ সংশ্লিষ্ট ৪২টি মামলায় রায় দিয়েছেন। সাজা হয়েছে ১০৫ জনের। এর মধ্যে ৬ শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি কার্যকর হয়েছে, ৪৭ দ-প্রাপ্ত পলাতক।

মৃত্যুদ- কার্যকর হয়েছে জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, মোহাম্মদ কামারুজ্জামান, আবদুল কাদের মোল্লা, মীর কাসেম আলী এবং বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ।

এ ছাড়া জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, এটিএম আজাহারুল ইসলাম ও জাতীয় পার্টির সাবেক নেতা সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সারের আপিল আবেদন নিষ্পত্তি হয়েছে। সাঈদী আমৃত্যু কারাদ-প্রাপ্ত হয়ে এখন কারাগারে। বাকি দুজনের রিভিউ আবেদন এখন বিচারাধীন। রিভিউ খারিজ হলেই তাদের দ- কার্যকর করা হবে। কারাদ- নিয়েই মারা গেছেন জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির গোলাম আযম, বিএনপির সাবেক মন্ত্রী আবদুল আলীম ও জামায়াতে ইসলামীর আরেক নেতা আবদুস সোবহান। এ ছাড়া বাকি ২৮টি আপিল এখন আপিল বিভাগে বিচারাধীন।

বিচার শুরু, অপেক্ষার অবসান

হানাদারদের এ দেশীয় দোসরদের বিচারের জন্য ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি ‘দ্য বাংলাদেশ কোলাবোরেটরস (স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল) অর্ডার, ১৯৭২’ প্রণয়ন করা হয়। এটি দালাল আইন হিসেবে পরিচিত। ওই সময় ৩৭ হাজার ৪৭১ জন কোলাবরেটর গ্রেপ্তার হয় এবং বিচার চলতে থাকে। ১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বর দুর্বল অভিযোগ ও আপেক্ষিকভাবে লঘু অপরাধের কারণে ২৬ হাজার কোলাবরেটরের প্রতি বঙ্গবন্ধু ক্ষমা প্রদর্শন করেন। গুরুতর অপরাধ হিসেবে হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ, ধর্মান্তরকরণের সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে ১১ হাজার কোলাবরেটর তখনও বিচারের জন্য বন্দি ছিল। ১৯৭৩ সালে প্রণয়ন করা হয় ‘দ্য ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনালস) অ্যাক্ট’।

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবার নির্মমভাবে হত্যার পর দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পাল্টে যায়। দালাল আইনে সাজাপ্রাপ্ত কয়েক হাজার অপরাধীকে রাতারাতি ছেড়ে দেওয়া হয়; বিলুপ্ত হয় দালাল আইন। শুরু হয় স্বাধীনতাবিরোধী এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধে জড়িতদের সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসন। অনেক যুদ্ধাপরাধী রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় হন মন্ত্রী-এমপি।

এরপর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য স্বাধীনতার পক্ষের মানুষ আন্দোলন সংগ্রাম শুরু করেন নব্বইয়ের দশকে। ১৯৯২ সালে ২৬ মার্চ গণআদালতের মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধী শীর্ষস্থানীয় জামায়াত নেতা গোলাম আযমকে প্রতীকী মৃত্যুদ- দেওয়া হয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত জোটের নির্বাচনী ইশতেহারে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের অঙ্গীকার করা হয়। ওই নির্বাচনে তারা সরকার গঠন করলেও দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু করা সম্ভব হয়নি। ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে এই অঙ্গীকার আরও দৃঢ়ভাবে উপস্থাপিত হয়। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করে। এর পর ২০০৯ সালের ২৯ জানুয়ারি সংসদে যুদ্ধাপরাধীদের দ্রুত বিচারের উদ্যোগ গ্রহণের প্রস্তাব ওঠে। ২০১০ সালের ২৫ মার্চ প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনালস) অ্যাক্ট ১৯৭৩-এর ৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী একজনকে চেয়ারম্যান করে তিন বিচারপতির সমন্বয়ে একটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। চড়াই-উতরাই পেরিয়ে অনেক চ্যালেঞ্জ সামনে নিয়ে শুরু হয় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। কিছুদিন পর আরও একটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়, যেটির কার্যক্রম চলে ২০১৫ সাল পর্যন্ত। মামলা কমে গেলে আবার দুটিকে একীভূত করা হয়। বর্তমানে সক্রিয় ট্রাইব্যুনালে তদন্ত শেষে ৩৩টি মামলায় ২১৫ জনের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ বিচারাধীন। ৩৮ আসামির বিরুদ্ধে ২৬টি মামলা তদন্তের বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে বলে ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা গেছে।

বিচার চলাকালে নানা আইনি প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়। ১৯৭৩ সালে আইনটি প্রণয়নের সময় ‘ব্যক্তি’ বা ‘ব্যক্তিগণের সমষ্টি’কে (গ্রুপ অব ইনডিভিজুয়াল) বা ‘সংগঠন’কে বিচারের আওতায় আনার সুযোগ ছিল না। ২০০৯ সালে ১৯৭৩-এর ধারা-৩ সংশোধন করে ‘ব্যক্তি’ বা ‘ব্যক্তিগণের সমষ্টি’-কেও বিচারের এখতিয়ার ট্রাইব্যুনালকে দেওয়া হয়। ২০১৩ সালে আরেকটি সংশোধনীর মাধ্যমে মানবতাবিরোধী বা যুদ্ধাপরাধে জড়িত ‘সংগঠন’কেও বিচারের আওতায় আনার বিধান সংযুক্ত হয়। এছাড়া ট্রাইব্যুনালের দেওয়া দ-ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের কোনো বিধান ছিল না। তবে আসামিপক্ষ আপিল করতে পারে। এ কারণে আবদুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদ- দেওয়ার পর দেশে বড় ধরনের আন্দোলন শুরু হয়। তার যাবজ্জীবন কারাদ-ের বিরোধিতা করে শাহবাগ চত্বরে গড়ে ওঠে ‘গণজাগরন মঞ্চ’। তীব্র আন্দোলনের মুখে ২০১৩ সালে সরকার আবারও আইন সংশোধন করে দ-ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আপিল করার সুযোগ সৃষ্টি করে। পরে কাদের মোল্লার রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। এই আপিলের শুনানি করে আপিল বিভাগ তার সাজা বাড়িয়ে মৃত্যুদ-ের রায় দেন। পরে তাকে ফাঁসির দড়িতে ঝোলানোর মাধ্যমে ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর রাতে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে প্রথম দ- কার্যকর করা হয় এ দেশের মাটিতে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.