‘কাজের প্রতি এমন নিষ্ঠা ও সততা খুবই কম দেখেছি’

গুণী নির্মাতা আজিজুর রহমানের প্রয়াণে শোকাহত ঢালিউড অভিনয়শিল্পী নাঈম-শাবনাজ। দর্শকদের জনপ্রিয় নাঈম–শাবনাজ জুটি জনপ্রিয় হওয়ায় আজিজুর রহমানের অবদান রয়েছে বলে মনে করেন তাঁরা। তাঁদের ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই ভালো সম্পর্ক ছিল। দুই সপ্তাহ আগেই আজিজুর রহমান তাঁদের স্মরণ করেছিলেন। সেই কথাগুলো এখনো ভুলতে পারছেন না নাঈম। এই দম্পতি মনে করেন, আজিজুর রহমান দেশের চলচ্চিত্রে অপসংস্কৃতি প্রবেশ করতে দেননি। সব সময় মৌলিক গল্পে কাজ করেছেন। তাঁর নির্মাণে কাজ করে তৃপ্ত নাঈম–শাবনাজ।

নাঈম বলেন, ‘আজিজুর রহমান চলচ্চিত্রের পুরোধা ব্যক্তিত্ব, একটি প্রতিষ্ঠান, চলচ্চিত্র সম্পর্কে বিষদ জানার এক অনন্য প্রতিষ্ঠান। যিনি একসঙ্গে দু–তিনটি সিনেমায় নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। শুটিংয়ে শান্ত থেকেছেন। তাঁকে কখনো রাগ করতে দেখিনি। আমাদের দেশের চলচ্চিত্রের অহংকার আজিজুর রহমান। তাঁর চলচ্চিত্রগুলো হয়েছে ব্যবসাসফল। তাঁর প্রতিটা ছবি বাস্তববাদী এবং বক্তব্যধর্মী। তিনি তাঁর সারা জীবন চলচ্চিত্র নির্মাণে ব্যয় করেছেন এবং বাংলাদেশ চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্রগুলো আলোচনায় থাকবে। তাঁর মতো এমন পরিচালক আমার জীবনে কমই দেখেছি।’

নাঈম ও শাবনাজের প্রথম সিনেমা শুটিংয়ের সময় থেকে আজিজুর রহমানের সঙ্গে পরিচয়। তাঁর কারণ ‘চাঁদনী’ সিনেমায় কিছু দৃশ্য ছিল পাহাড়ের ওপরে। তখন এহতেশামের বয়স বেশি ছিল। তিনি পাহাড়ে উঠতে পারতেন না। এমন দৃশ্যের শুটিংয়ের জন্য শিষ্য আজিজুর রহমানকে সঙ্গে নিতেন। শুধু শুটিংই নয়, সম্পাদনার সময়েও থাকতেন এই পরিচালক। নাঈম বলেন, ‘আমাদের কমসংখ্যক ছবির মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছবির পরিচালক ছিলেন আজিজুর রহমান। আমাদের জুটির দ্বিতীয় সিনেমা “দিল”-এর পরিচালকও তিনিই ছিলেন। এর পর থেকে আমাদের মধ্য সম্পর্কের দাঁড়িয়েছিল পারিবারিক জায়গায়। অনেকবার তিনি টাঙ্গাইলে গিয়েছেন। প্রায়ই নিয়মিতই তাঁদের কথা হতো।’

কাজের প্রতি এমন নিষ্ঠা ও সততা খুবই কম দেখেছি

শাবনাজ বলেন, ‘“দিল” সিনেমা আমাদের জুটির দ্বিতীয় ছবি। পরপর দুটি সিনেমাই সফল হয়। এর মধ্য দিয়ে আমাদের জুটি শক্ত হয়। পরে “জিদ” এবং “ঘরে ঘরে যুদ্ধ” চলচ্চিত্রে কাজ করেছি। আমাদের শেষ সিনেমা সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অনেক স্মৃতি। ১৯৯৬ সালে আমাদের জুটির শেষ ছবি ছিল “ঘরে ঘরে যুদ্ধ”। পরে ২০০২ সালে আজিজুর রহমান ভাই পরিচালিত “ডাক্তার বাড়ি” চলচ্চিত্র ছিল আমার শেষ কাজ করা। তিনি ছিলেন শুটিংয়ে গোছানো মানুষ। সহজেই সবাইকে ম্যানেজ করে কাজ শেষ করতে পারতেন। কাজের প্রতি এমন নিষ্ঠা ও সততা খুবই কম দেখেছি। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি কালজয়ী চলচ্চিত্র “ছুটির ঘণ্টা”। যা একমাত্র আজিজুর রহমানের পক্ষেই সম্ভব হয়েছে।’ এই সময় শাবনাজ আরও বলেন, ‘আজিজ ভাইয়ের পরিচালনায় চলচ্চিত্রে অভিনয় করা ছিল প্রতিটি নায়ক, নায়িকার জন্য অনেক সৌভাগ্যের ব্যাপার। আমরা একজন অভিভাবককে হারালাম, যার শূন্যতা পূর্ণ হওয়ার নয়।’

আজিজুর রহমানের শেষ কথাগুলো যেন এখনো কাজে বাজছে নাঈমের। দুই সপ্তাহ আগেই হঠাৎ কানাডা থেকে ফোন পান নাঈম–শাবনাজরা। আজিজুরের মেয়ে বিন্দী রহমান ফোন করেছেন। বিন্দী জানান, তাঁর বাবা নাঈম-শাবনাজদের সঙ্গে কথা বলতে চান। নাঈম বলেন, ‘তখন আজিজুর রহমান হাসপাতালের বেডে। ভালোভাবে কথা বলতে পারছিলেন না। বললেন, দোয়া করিস বাবা। তখনো জানতাম না আজিজুর রহমান সাহেবের সঙ্গে সেটিই শেষ কথা হবে। আমি বলেছিলাম, আপনি সুস্থ হয়ে দেশে ফিরবেন। আবার আমাদের দেখা হবে। পরে খবর পাই তিনি মারা গেছেন।’

১৯৬৭ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ৫৩টি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছেন আজিজুর রহমান। ‘মধুমালা’, ‘সমাধান’, ‘স্বীকৃতি’, ‘অপরাধ’, ‘অতিথি’, ‘সাম্পানওয়ালা’, ‘অশিক্ষিত’, ‘জমিদার বাড়ির মেয়ে’, ‘মায়ের আঁচল’, ‘জনতা এক্সপ্রেস’, ‘ছুটির ঘণ্টা’, ‘মাটির ঘর’, ‘সোনার তরী’, ‘অভিমান’, ‘পরিচয়’, ‘প্রতিদান’, ‘ফুলেশ্বরী’, ‘দিল’, ‘জিদ’,‘ লজ্জা’, ‘কথা দাও’, ‘ঘরে ঘরে যুদ্ধ’, ‘ডাক্তার বাড়ি’ ইত্যাদি। এ ছাড়া ১০টি চলচ্চিত্র প্রযোজনাও করেছেন তিনি। এই পরিচালক ৮২ বছর বয়সে ১৪ মার্চ কানাডার একটি হাসপাতালে মারা যান।

Leave a Reply

Your email address will not be published.