কারখানায় শ্রমিকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা

কাজী মোহাম্মদ ইব্রাহীম জুয়েল : গত ছয় মাসে পোশাক কারখানার বাইরে অন্যান্য কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে ৮২টি এবং এসব অগ্নিকাণ্ডে নিহত হয়েছেন অন্তত ১২৮ জন এবং দগ্ধ বা আহত হয়েছেন ২৮৩ জন। অর্থাৎ এ সময়ে প্রতি দুই দিনে একটি কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। তাহলে আমাদের কারখানাগুলোর কর্মপরিবেশ বা শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তা কোথায়? প্রতিনিয়ত কারখানা বাড়ছে। কিন্তু কারখানাগুলোর কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এত উদাসীনতা কেন?

শুধু কারখানা নয়, মার্কেট, শপিং মল, দোকানপাট, এমনকি অনেক সেবা সংস্থায়ও অগ্নিদুর্ঘটনা রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা থাকে না। এমন অনেক জায়গায় কারখানা স্থাপিত হয় যেখানে ফায়ার সার্ভিসের গাড়িও ঢুকতে পারে না। ফলে এসব জায়গায় অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটলে প্রাণহানি বেশি হয়। বৃহস্পতিবার বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ‘কর্মক্ষেত্রে অগ্নিদুর্ঘটনা ও শ্রমিক নিরাপত্তা : নিরসনের উদ্যোগ কোথায়?’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে এমন অনেক তথ্যই তুলে ধরা হয়।

গবেষণায় উঠে আসে ২০০০ সালের শুরুর দিকে বাংলাদেশে তৈরি পোশাকের বাইরে মোট কারখানার সংখ্যা ছিল ২৪ হাজার ৭৫২। বর্তমানে তা বেড়ে হয়েছে ৪৬ হাজার ১১১টি। বেশির ভাগ কারখানার কর্মপরিবেশ উপযুক্ত নয়। রয়েছে তদারকি বা নজরদারির অভাব। ফলে বাড়ছে অগ্নিদুর্ঘটনা। বাড়ছে প্রাণহানি।

সরকার বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নেতৃত্বে যে কারখানা পরিদর্শন কমিটি করেছে, তাদের কাজও সন্তোষজনক নয়। গত বছরের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে পাঁচ হাজার কারখানা পরিদর্শনের কথা থাকলেও এই কমিটি গত ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত পরিদর্শন করেছে মাত্র ৮৭৫টি।
তাজরীন ফ্যাশনস, নিমতলী কিংবা চুড়িহাট্টার অগ্নিকাণ্ডের দুঃসহ স্মৃতি এখনো আমাদের তাড়িয়ে বেড়ায়। তার ওপর গড়ে প্রতি দুই দিনে একটি কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ভাবতেও কষ্ট হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, এসব কারখানায় জরুরি মুহূর্তে বাইরে আসার পথ থাকে না কিংবা থাকলেও তালাবদ্ধ করে রাখা হয়। বের হতে না পারার কারণেই বেশির ভাগ শ্রমিক মারা যান। তদুপরি অনেক কারখানায় তেলসহ বিভিন্ন দাহ্য পদার্থ এমনভাবে গাদাগাদি করে রাখা হয় যে আগুন মুহূর্তে পুরো কারখানায় ছড়িয়ে পড়ে।
আবার কারখানাগুলোতে অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা থাকে না বললেই চলে। কোনো কোনো কারখানায় ফায়ার এক্সটিঙ্গুইশার থাকলেও দেখা যায় সেগুলো প্রায়ই হয় মেয়াদোত্তীর্ণ, নয়তো এগুলো চালানোর মতো প্রশিক্ষণও কারো থাকে না। কারখানা মালিকদের এমন অবহেলার কারণেই প্রতিবছর এত প্রাণহানি হচ্ছে। অথচ সেগুলো নিয়ন্ত্রণে কিংবা পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপও খুবই কম।
প্রতিটি বড় অগ্নিদুর্ঘটনার পর এক বা একাধিক তদন্ত কমিটি হয়। তদন্ত রিপোর্টে অনেক সুপারিশ উঠে আসে। কিন্তু অবস্থার পরিবর্তন হয় না। প্রশ্ন হচ্ছে, শ্রমিকদের জীবন নিয়ে এমন অবহেলা আর কত দিন চলবে? আমরা চাই, কারখানার কর্মপরিবেশ উন্নয়নে ও অগ্নিদুর্ঘটনা রোধে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

Leave a Reply

Your email address will not be published.