রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে ২৫০ অবৈধ লেবেল ক্রসিং যেন মৃত্যুফাঁদ

 

স্টাফ রিপোর্টার

২০২০ থেকে ২০২২ সালের ২৮ জুলাই পর্যন্ত সারাদেশের রেলক্রসিংসমূহে ১১৬টি দুর্ঘটনায় ২১৯ জন নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন।
বছর অনুযায়ী পরিসংখ্যানের পাশাপাশি দুর্ঘটনা এড়াতে বেশ কিছু সুপারিশও করেছে সংগঠনটি। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২০ সালে ৩৮ দুর্ঘটনায় ৬৯ জন, ২০২১ সালে ৪৩ দুর্ঘটনায় ৭৬ জন, ২০২২ সালের ২৮ জুলাই পর্যন্ত ৩৫ দুর্ঘটনায় ৭৪ জন মারা যান।

সবশেষ শুক্রবার (২৯ জুলাই) দুপুরে চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে রেলক্রসিংয়ে ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে।
সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে রেলক্রসিং দুর্ঘটনার কারণসমূহও চিহ্নিত করা হয়।
কারণসমূহ হলো- অননুমোদিত ও অবৈধ বিবেচনা করে বহু সংখ্যক রেলক্রসিংয়ে গেটম্যান ও গেটবারের ব্যবস্থা না করা, বৈধ রেলক্রসিংসমূহে গেটম্যানদের দায়িত্বে অবহেলা ও গেটম্যান হিসেবে লোকবলের সংকট, যানবাহনের চালক ও সড়ক ব্যবহারকারীদের মধ্যে অসচেতনতা ও অধৈর্য

মানসিকতা, দুর্ঘটনায় দায়ীদের উপযুক্ত শাস্তি না হওয়া ও রেলপথ ব্যবস্থাপনায় আইনের শাসনের অভাব।

রেলক্রসিং দুর্ঘটনা এড়াতে সুপারিশসমূহ

সব রেলক্রসিংয়ে গেটম্যান নিয়োগ ও উপযুক্ত গেটবারের ব্যবস্থা করা, রেলক্রসিংয়ে প্রযুক্তির ব্যবহার করা, জনবল সংকট নিরসন করে রেলপথ

ব্যবস্থাপনায় সুশাসন নিশ্চিত করা, সড়ক ব্যবহারকারীদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টিতে গণমাধ্যমে প্রচারণা চালানো।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দেশের দুই হাজার ৯৫৯ কিলোমিটার রেলপথে দুই হাজার ৮৫৬টি রেলক্রসিং আছে। এর মধ্যে এক হাজার ৪৯৫টি বৈধ ও এক হাজার ৩৬১টি অবৈধ। ৯৬১টি রেলক্রসিংয়ে কোনো গেটম্যান নেই। দেশে ৮২ শতাংশ রেলক্রসিং অনিরাপদ।

প্রতিবেদনে শুধুমাত্র রেলক্রসিংয়ে সংঘটিত দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি উল্লেখ করা হয়েছে। এর বাইরে রেলট্র্যাকে বহু দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে সেগুলো এ

হিসাবে যুক্ত করা হয়নি বলে জানানো হয়।

রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে ২৫০টিরও বেশি অবৈধ লেবেল ক্রসিং রীতিমত মৃত্যু ফাঁদে পরিণত হয়েছে। রেলের অনুমোদিত লেবেল ক্রসিংগুলোতেও গেটম্যান

যথাযথ দায়িত্ব পালন না করায় ঘটছে দুর্ঘটনা। গত পাঁচ বছরে বৈধ-অবৈধ রেলক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা ও ট্রেনে কাটা পড়ে শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

 

সর্বশেষ শুক্রবার (২৯ জুলাই) মিরসরাইয়ের খৈয়াছড়া ঝর্না এলাকার বৈধ লেবেল ক্রসিংয়ে মাইক্রোবাসে ট্রেনের ধাক্কায় ১১ তরুণের মর্মান্তিক মৃত্যু

হয়েছে।
রেলওয়েও সূত্রে জানা যায়, রেল পূর্বাঞ্চলে বৈধ লেবেল ক্রসিং-এর সংখ্যা প্রায় ৮৫০। এর মধ্যে ৬০০ লেবেল ক্রসিং রেলওয়ে অনুমোদিত বা বৈধ। মূলত

 

স্থানীয় মানুষ নিজেদের চলাচল বা যানবাহন চলাচলের সুবিধার্থে নিজেদের মতো করে অবৈধ এসব ক্রসিং তৈরি করে নেয়। এ সব ক্রসিংয়ে কখনো গেটম্যান থাকে না। ফলে এগুলোতে দুর্ঘটনা ঘটে অহরহ। এছাড়াও বৈধ ক্রসিংগুলোতেও গেটম্যানদের অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার পাশাপাশি বেপরোয়া যানবাহনের কারণে প্রায় দুর্ঘটনা ঘটে।

গত ২০১৭ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত গত ৫ বছরে বৈধ ও অবৈধ রেলক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা ও ট্রেনে কাটা পড়ে প্রাণ হারিয়েছে শতাধিক মানুষ। পঙ্গু হয়েছে অসংখ্য মানুষ।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের আওতাধীন চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলা থেকে দক্ষিণ চট্টগ্রামের দোহাজারী পর্যন্ত ১০০ কিলোমিটার রেলপথের মধ্যে বৈধ ও অধৈব ৮০টি রেলক্রসিং রয়েছে। এর মধ্যে শুধু মিরসরাই থেকে চট্টগ্রান নগর পর্যন্ত এলাকায় অবৈধ ক্রসিং-এর সংখ্যা ৩০টির বেশি। এসব ক্রসিং প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা। মৃত্যু বাড়ছে ট্রেনে কাটা পড়ে।
সর্বশেষ শুক্রবার (৩০ জুলাই) মিরসরাই উপজেলার খৈয়াছড়া ঝর্ণা থেকে ফেরার পথে রেল ক্রসিংয়ে মাইক্রোবাসে মহানগর প্রভাতী ট্রেনের ধাক্কায় ১১ জন তরুণের মৃত্যু ঘটে। এই ঘটনায় ক্রসিংয়ের গেটম্যানের অবহেলা দায়ী করে মামলা করা হয়েছে। আটক করা হয়েছে সাদ্দাম হোসেন নামের ওই গেটম্যানকে।

অবৈধ রেল ক্রসিং-ও দুর্ঘটনা প্রসঙ্গে চট্টগ্রামস্থ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় মহাব্যবস্থাপক জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, অবৈধ রেলক্রসিং বন্ধে রেলওয়ে সব সময় তৎপর রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে অবৈধ রেলক্রসিং বন্ধ করে কাঁটা তার দিয়ে ঘেরাও করে দিলেও স্থানীয়রা কৌশলে এ সব প্রতিবন্ধক খুলে নিয়ে যায়।
মহাব্যবস্থাপক জানান, বৈধ ও অবৈধ সকল ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা এবং ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যুর ঘটনায় রেলওয়ে পক্ষ থেকে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দুর্ঘটনার কারণ এবং এর সঙ্গে কারও দায়িত্বে অবহেলা পাওয়া গেছে, তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা জানান, অবৈধ রেলক্রসিং বন্ধ করতে রেলওয়ের পক্ষ থেকে নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। কিন্তু এরপরও শতভাগ বন্ধ করা সম্ভব হয় না স্থানীয়দের অসহযোগিতার কারণে। এছাড়াও বৈধ ক্রসিংগুলোতে রেড এলার্ম সিগন্যালের পাশাপাশি সতর্ক অবস্থায় গেটম্যান দায়িত্ব পালন করেন। এরপরও কিছু গাড়ি চালকের বেপরোয়া গাড়ি চালনা, অসতর্কতা, কখনো কখনো গেটম্যানের অবহেলার কারণে দুর্ঘটনা ঘটে। এই ক্ষেত্রে গেটম্যানের দায়িত্বহীনতার প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published.