চাঁদপুরের হাট-বাজারে নিষিদ্ধ পলিথিনের ছড়াছড়ি

আবদুল গনি

চাঁদপুর জেলার অধিকাংশ হ্টা বাজারের দোকানে, মাছ বাজারে, তরি-তরকারির দোকানে পলিথিন ব্যাগে এখন সায়লব। বাজারের স্থায়ী দোকান থেকে খোলা বাজারের খুচরা যে কোনো দ্রব্য কেনা মাত্র পলিব্যাগে ঢুকিয়ে ক্রেতাকে স্ব-হাস্য বদনে দিচ্ছে। বিশেষ করে গ্রাম্য ছোট ছোট হাট বাজারের মুদি দোকানগুলোতে এ পলিথিনের ব্যবহার ও কেজি দরে অন্য দোকানীদের কাছে বিক্রি করার দৃশ্য ব্যাপকহারে দেখা যাচ্ছে ।

আগে ছিলো এ সব পলিথিন ব্যাগ নানা রং বেরং এর। এখন শুধুই সাদা ধব ধবে। এ প্রবণতা একইবারেই বন্ধ ছিলো। এখন পুনরায় চালূু হচ্ছে। এটা বন্ধ না করা গেলে পরিবেশে আবারও বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্ঠি হবে। প্রয়োজনীয় আইন আছে। কিন্তু কতটুকু প্রয়োগ হচ্ছে তা বুঝা যাচ্ছে না ।

পলিথিন ব্যাগ ও প্ল্যাস্টিক দ্রব্য ব্যবহার দেশের পরিবেশের ওপর মারাত্নক প্রভার ফেলেছে। পলিথিন পরিবেশগত ভারসাম্যকে দারুনভাবে ব্যাহত করে চলছে। তাই পলিথিন মুক্ত দেশ গড়তে জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সকলকেই এগিয়ে আসা উচিৎ।

যতদূর জানা গেছে, ১৯৪৫ সালের দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর বিভিন্ন দেশের বিপুল পরিমাণ প্ল্যাস্টিক দ্রব্যর ব্যবহার শুরু হয়। ফলে আমেরিকার জনৈক বিজ্ঞানী হালকা,শক্ত নমনীয় এ পলিথিন উদ্ভাবন করেন। সে থেকে ১৯৫৮ সালের সর্বপ্রথম আমেরিকায় এর উৎপাদন ও ব্যবহার শুরু হয়।

অপর এক সূত্রে জানা গেছে,১৯৭৬ সালে ফিলিপাইনের বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ড. সোকানো গবেষণা করে ক্যারোলিনা বা এক ধরণের টেট্রন উদ্ভাবন করেন। এর ওপর ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে ৮০’র দশকে পলিথিন ও প্ল্যাস্টিক দ্রব্যবাজারজাত শুরু হয়। সে থেকেই আমাদের দেশে এর প্রচলন অনুপ্রবেশ করে।

১৯৮৩ সালের বাংলাদেশের ঢাকায় সর্বপ্রথম পলিথিন উৎপাদন কারখানা স্থাপিত হয়। ধীরে ধীরে ব্যাপক চাহিদা মেটাতে ২০০০ সাল পর্যন্ত সারা দেশে ১৫ হাজার ছোট বড় পলিথিন কারখানা স্থাপিত হয়। প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলেও পলিথিন দেশের সর্বত্র পরিবেশের ওপর মারাত্নক হুমকি সৃষ্টি করে আসছে। বিশেষ করে দেশে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সম্মুখীন হচ্ছে কোটি কোটি মানুষ।

পলিথিন ব্যাগ ব্যবহারের ব্যাপকতা যে কতটুকু বৃদ্ধি পেয়েছে-তা বলে শেষ করা যাবে না। এক কথায় দৈনন্দিন জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রে পলিথিন এর ব্যবহার মাত্রারিক্ত বৃদ্ধি পাচ্ছিল। দেশের ছোট, বড়, শহর, বন্দর নগর হাট বাজার রেলস্টেশন,লঞ্চ স্টেশনের যে কোনো দোকানেই পলিথিন ব্যাগ পাওয়া যায়।

যে কোনো দ্রব্য ক্রয় করা মাত্রই দোকানি হিসেবে যাবতীয় জিনিসপত্র ব্যাগ ভর্তি করে স্বহাস্য বদনে পলিথিন প্রদান করে থাকে। দেশের এর ব্যবহার সকল প্রকার দ্রব্যের মাত্রা ছড়িয়ে গেছে। বর্তমানে মাছও পলিথিন মোড়িয়ে মাচ বিক্রেতা দিচ্ছে।

এক সমীক্ষা দেখা গেছে,দেশে এক সময় প্রতিদিন ৬০ লাখ পলিথিন ব্যাগ বর্জ্য হিসেবে জমা হতো। এভাবে প্রতি বছর ১৬২ কোটি ব্যাগ জমা হতো। ৮০% ভাগই যেখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকে। বাকি ২০% মাত্র অপসারণ করা সম্ভব ছিলো। এর সহজ ব্যবহার ও সহজ লভ্যতার কারণে দিনদিনই এর ব্যবহার বৃদ্ধি হচ্ছে। ফলে মাত্র কয়েক বছরেই আমাদের পরিবেশকে মারাত্মক বিপন্নতার দিকে যাচ্ছে।

পলিথিন পচনশীল নয় বিধায় পরিবেশের ওপর মারাত্নক হুমকি। এটা সম্পূর্ণ রাসায়নিক পদার্থ দ্বারা তৈরি। বিজ্ঞানীদের মতে, পলিথিন বা প্ল্যাস্টিক ক্ষয় হয় না এবং অনেক বছর অক্ষত থাকে। ইহা মাটির জন্যে খুবই ক্ষতিকর।

মাটির মারাত্নক ক্ষতি করে,মাটিতে সূর্য রশ্মি পৌঁছাতে বিঘ্ন ঘটায়, ফসলের জমিতে উৎপাদন ব্যহত করে ,আগুনে পুড়লে জনস্বাস্থ্যের মারাত্নক ক্ষতি করে, শহর নগর ,বন্দরের সকল প্রকার ড্রেনেজ ব্যবস্থার মারাত্নক বিঘ্ন সৃষ্টি করে, নালা নর্দমা বন্ধ করে মারাত্মক দুগর্ন্ধ বাড়ায় বিধায় জনস্বাস্থ্যের মারাত্নক ক্ষতিকর,শহর বা গ্রামের গৃহিণীরা তাদের রান্নাঘরের আর্বজনা ও শিশুদের মলমূত্র পলিথিনে ভরে বহুতল ভবনের জানালা দিয়ে ফেলে জনস্বাস্থ্যের মারাত্নক ক্ষতি করত । পশু পাখিরা তা পা দিয়ে ছড়িয়ে পরিবেশ দূষণ বাড়াত ।

অপর দিকে এর ব্যাপক ব্যবহারের ফলে দেশের সোনালী আঁশের সকল প্রকার দ্রব্য সামগ্রীর শিল্প কারখানা ধ্বংস হয়ে বেকার সমস্যা বাড়িয়েছে এবং এসব শিল্পের দ্রব্য বিলুপ্ত ঘটিয়েছে।

পৃথিবীর উন্নত দেশেই পলিথিন বা প্ল্যাস্টিক দ্রব্য ও ব্যাগের উৎপাদন, ব্যবহার ও বাজারজাত সম্পূর্ণ নিষেধ করা হয়েছে। এছাড়াও দ্রুত পচনশীল ও ধ্বংস হয় এমন ব্যাগ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পলিথিনের বিকল্প দ্রব্য উৎপাদন করছে। যাহার কোনোই প্রভাব নেই।

পলিথিন ব্যাগ যেমন পরিবেশ ক্ষতি করছে তেমনি দেশের চলমান অর্থনৈতির ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। উহা সহজলভ্য ও সস্তা হওয়ায় পাটের তৈরি ব্যাগ ব্যবহার বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে পাট ও পাটজাতদ্রব্যের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ফলে বেকার সমস্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। পলিথিন ব্যাগ উৎপাদনের নিয়োজিত মাত্র কয়েক হাজার লোক দেশের ১৬ কোটি মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের মারাত্নক ক্ষতি করে চলছে।

প্রসঙ্গত,সর্বপ্রথম ১৯৯৪ সালে পলি ব্যাগ উৎপাদন,আমদানি,ও বাজারজাতকরণ নিষিদ্ধ করা সত্ত্বেও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও শ্রমিকের হুমকির ভয়ে তা আর কার্যকরি করা সম্ভব হয় নি।

সরকার দেশের সার্বিক দিক পর্যালোচনা করে এর সকল প্রকার ব্যবহার,উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে ১ জানুয়ারি ২০০২। ১ মার্চ ২০০২ থেকে সারা দেশে এর কার্যক্রম অব্যহত থাকে। যা অত্যন্ত আশাব্যঞ্চক ছিলো। বর্তমানে পুনরায় ভিন্নভাবে বাজার দখল করে চলছে।

সরকার পলিথিন ব্যাগ উৎপাদনও ব্যবহার বন্ধ করে এর বিকল্প দ্রব্য উৎপাদনও বাজারজাতকরণের ব্যাপারে গুরুত্ব সহকারে পদক্ষেপ নিয়েছে।ফলে পলিথিনের বিকল্প দ্রব্যগুলোর দাম ও সহজলভ্য করার প্রক্রিয়া সৃষ্টি সহ ব্যাপক গণসচেতনতা বৃদ্ধি পায়।

দেশ ও জাতীয় স্বার্থে দেশের প্রতিটি নাগরিককে পলিথিন বর্জনের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে তা কার্যকর করতে সহায়তা করতে হবে। পলিথিনের বিকল্প দ্রব্য ব্যবহারের জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হবে। সরকারকেও তার সিদ্ধান্ত বহাল রাখতে কঠোর হতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *