চাঁদপুরে গরু নিয়ে খামারিরা বিপাকে

করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে এবার ঈদে অবিক্রিত গরু নিয়ে খামারি আর ব্যাপারীরা বিপাকে পড়েছেন। কোরবানির গরুর ব্যবসায় কখনো লাভ আবার কখনো লোকসান গুনতে হয় ব্যবসায়িদেরকে। তাই এবার বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছে তারা। কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে মুনাফা লাভের আশা দেখলেও লকডাউনের কারণে মাথায় হাত পড়েছে গরু খামারিদের। ঈদের দিন যত এগিয়ে আসছিল, ততই শঙ্কা ঘিরে ধরছে তাদের।

এবার ঈদে উপলক্ষে ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন আনু পাটোয়ারী অন্য জেলা থেকে চাঁদপুর ৮৩টি গরু আনেন । লোকসান দিয়ে তিনি ৫৯টি বিক্রি করেছেন। কিন্তু ২৪টি বিক্রি করতে পারেনি। গরুগুলো বিক্রি করতে না পেরে বাড়িতে ফিরিয়ে এনে বিপাকে পড়েছেন তিনি। কারণ, তার গরু রাখার কোন জায়গা নেই। পাশাপাশি গরুগুলোর খাবারের পেছনে অর্থ খরচ হচ্ছে। একে তো গরু বিক্রি করে লোকসান, তার ওপর আবার গরু বিক্রি করতে না পেরে ফেরত আনতে হয়েছে। সব মিলিয়ে মহাবিপাকে পড়েছেন তিনি।

ভোলা জেলার দক্ষিণ আইচা থেকে চাঁদপুর নিয়ে আসা বেশিরভাগ গরুই এবার বিক্রি হয়নি। পরিবহন ভাড়া করে ফিরিয়ে এনে বিপাকে পড়েছেন তারা। কোরবানির পরে বাজারে গরুর চাহিদা কমে যায়। ফলে গরুগুলো এখন চাইলেই বিক্রি করা যাবে না। এখন বিক্রি করতে গেলে আরও লোকসান হবে। আবার কিছু কিছু গরু এখন অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তাদেরকে আগে সুস্থ করে তুলতে হবে। তারপরে আবার হাটে তুলে বিক্রি করতে হবে। বেশিরভাগ ব্যবসায়ীর ঘরে জায়গা নেই। কেউ বেঁধে রেখেছেন নিজের বাড়ির বারান্দায়।
আবার গরুগুলো একটি পরিবেশে অভ্যস্ত ছিল। এখন নতুন পরিবেশে লালন পালনে ঝামেলা বেশি। চাঁদপুর আনা-নেয়ার ঝক্কি-ঝামেলায় প্রতিটি গরুর ওজন কমে গেছে। তাদের স্বাস্থ্য ধরে রাখাও একটি বড় সমস্যা।

আনোয়ার হোসেন আনু পাটোয়ারী বলেন, ‘আগামী ২-৩ মাসের মধ্যে গরুর দাম তুলনামুলকভাবে কম হবে। কারণ, মানুষের কাছে কোরবানির মাংস থেকে যাবে। এসময়ে গরু বিক্রি করা কঠিন হবে। তাই গরুগুলোকে লালন-পালন করার জন্য নতুন একটি খামার তৈরি করতেছি।’

করোনা সংক্রমণের কারণে গেল বছরেও ব্যবসা করতে পারেননি গরু খামারি ও ব্যবসায়ীরা। এবারো একই অবস্থা। পথে নামা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। গত ১৭ জুলাই ব্র্যাক ব্যাংক চাঁদপুর শাখা থেকে ১৮ লাখ টাকা লোন নিয়েছি। এই লোন কিভাবে পরিশোধ করব তা একমাত্র আল্লাহই ভাল জানে।

চাঁদপুর শহর নিকটবর্তী কয়েকটি খামারিদের সাথে আলাপে জানা গেছে, কোরবানির ঈদ ঘিরে প্রতি বছরের মতো এবারো গরু প্রস্তুত করেছিলেন তারা। বিক্রির জন্য অনেক স্থানে কোরবানির হাট বসেছিল। তবে গত বছরের মতো এবারো বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল করোনা ভাইরাস।

চাঁদপুর শহরের দক্ষিণ গুনরাজদী পাটোয়ারী বাড়ি আনোয়ার হোসেন আনু পাটোয়ারী ২০ কাঠা জমিতে ১২ বছর আগে আর এস এগ্রো নামে একটি গরু খামার প্রতিষ্ঠা করেন । ২০০৯ সালের থেকে এই খামারের যাত্রা শুরু হয়। প্রথমে ৪টা দেশি শাহীওয়াল গরু দিয়ে। কোরবানির ঈদ টার্গেট করে খামারে লালনপালন করেছেন। করোনার কারণে গত বছর ব্যবসা মন্দা গেলেও এ বছর ঘুরে দাঁড়ানোর আশা ছিল আনু পাটোয়ারীর। কিন্তু চলমান লকডাউনে আনু পাটোয়ারীর সেই আশা ফিকে হয়ে গেছে।

তিনি বলেন, লকডাউনের আগে মাত্র ৫৯টি গরু বিক্রি হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত আর কোনো গরু বিক্রি করতে পারিনি। লকডাউন থাকলে ব্যবসায় বড় ধরনের ধস নামার আশঙ্কা করছেন তিনি।

আনু পাটোয়ারীর খামারে রয়েছে, দেশি শাহীওয়াল, ভারতীয় বলদ, অস্ট্রেলিয়ান ফিজিয়ান, ইন্ডিয়ান হাসা, ঘুট্ট ও বাদশা। বেশ কয়েকটি দামি গরুও রয়েছে। গরু লালনপালনের জন্য রয়েছে কয়েকজন কর্মচারী। কর্মচারীসহ গরুর খাবারের মাসিক ব্যয় অনেক। এখন যদি গরু বিক্রি করা না হয়, তাহলে কী যে হবে এ চিন্তায় অস্থির হয়ে পড়েছেন তিনি।
অপর গরুর ফার্মের মালিক মুন্না তালুকদার হতাশা ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, লকডাউনের কারণে গরুর ব্যবসা কী যে হয়, তা বোঝা যাচ্ছে না। সবকিছু অনিশ্চয়তায় চলে গেছে বলে দাবি করেন তিনি। তিনি বলেন, তার ফার্মটি ৭ বছর আগে স্বল্প পুঁজি নিয়ে শুরু হয়। তখন খোলা জায়গা ছিল, বড় মাঠ ছিল। গরু চড়াতে সমস্যা ছিল না। এখন জায়গা-জমির সমস্যা। তাই ঘরের ভেতরে রেখেই গরু-ছাগল পালন করতে হয়।

স্টাফ রিপোর্টার, ১০ আগস্ট, ২০২১;

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *