চাঁদপুরে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে

ফরিদুল ইসলাম বর্ষা এখনো আসেনি তবে এসেছে পানি ও বৃষ্টি। সিলেটে বন্যার কারণে ভাটি অঞ্চল চাঁদপুরের খাল, বিল ও নদী-নালায় দেখা দিয়েছে পানি বৃদ্ধি। একেতো বন্যার পানি এর সাথে যুক্ত হচ্ছে বৃষ্টি। দুই এ মিলে জেলার খাল, বিল আর পুকুর ডোবাতে সীমাহীন নতুন পানির আধিক্য দেখা দিয়েছে। ফলে অপরিপক্ক শিশুরা নতুন ভরা পানির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ছে। এতে বাড়ছে পানিতে পড়ে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা। ইতোমধ্যে হাইমচর, মতলব ও ফরিদগঞ্জে বেশ কয়েকটি শিশু পানিতে পড়ে মৃত্যু হয়েছে।
সমীক্ষায় দেখা গেছে, পানিতে ডুবে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে চট্টগ্রাম বিভাগে। পরের অবস্থানে আছে ঢাকা বিভাগ। সবচেয়ে বেশি মারা গেছে নেত্রকোণা জেলায়। এরপরের অবস্থানে আছে নোয়াখালী, চাঁদপুর ও কুমিল্লা। সবচেয়ে কম মৃত্যু হয়েছে শরীয়তপুরে।
এ ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে সতর্কতার কথা বলা হলেও অনেক বাবা-মা সতর্কতা অবলম্বন করছেন না। যার ফলে মহামারির মতো পানিতে ডুবে মৃত্যুর প্রবণতা বাড়ছে। শিশুর জীবন রক্ষায় বাবা-মা এবং অভিভাবকদেরকে আরো স্বচেতন ও সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বাবা মায়ের অসর্কতাই পানিতে পড়ে শিশু মৃত্যুর মূল কারণ।
তাছাড়া অনেক পরিবারে দেখা যায় শিশুর সাঁতার শেখার বয়স হলেও তাকে সাতার শিখানো হচ্ছে না। সাঁতার শিখানো নিয়ে কালক্ষেপণ করা হয়। এটাও মস্তবড়ো ভুল বলে মনেকরছেন তারা। সবার উচিত সন্তানকে সময়মোত সাঁতার শেখানো।
এছাড়া বর্তমানে সাঁতার শেখানোর জন্য শহরে সুইমিংপুল থাকলেও এর কোন কার্যকারিতা না থাকায় শহুরে শিশুরাও সাঁতার শিখতে পারছে না। ফলে সবখানেই সৃষ্টি হয়েছে অসাবধানতা ও অসচেতনা আর ঝুঁকি। এর থেকে বের হতে না পারলে শিশুর জীবন আরো মারাত্ম ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।
আমাদের চাঁদপুরে বর্ষা মওসুম এলে প্রতিবছরই অসংখ্য শিশু পানিতে ডুবে মৃত্যু হয়। এরপরেও কেউ সচেতন হচ্ছে না। অকালে প্রাণ হারায় শিশু আর স্বপ্ন ভাঙ্গে বাবা মায়ের। এমন অপুরনীয় ক্ষতি থেকে মুক্তির পথ হলো স্বচেতনতা।
মূলত বাংলাদেশে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর হার খুবই ভয়াবহ। একটি জরিপের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত দেড় বছরে এক হাজার ৪০০ জন মানুষ পানিতে ডুবে মারা গেছেন। যাদের মধ্যে ৮৩ শতাংশই শিশু।
২০১৬ সালে করা বাংলাদেশ হেলথ অ্যান্ড ইনজুরি সার্ভে অনুযায়ী, দেশে ১ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিশুমৃত্যুর (আঘাতজনিত) ৩৭ শতাংশই হয় পানিতে ডুবে। সে হিসাবে বছরে সাড়ে ১৪ হাজার শিশু ডুবে মারা যায়। এর মধ্যে ৭১ শতাংশই ২ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশু। ২৮ শতাংশ শিশুর বয়স ৫ থেকে ৯ বছর।
শিশুমৃত্যু রোধ, পুষ্টি ইত্যাদি খাতে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বড় বিনিয়োগ থাকলেও পানিতে ডুবে মৃত্যু রোধে তৎপরতা একেবারেই কম।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এই মৃত্যু প্রতিরোধে ১০টি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছে। এর তিনটিই বাংলাদেশের সাফল্যের অভিজ্ঞতা থেকে নেওয়া। এগুলো হলো শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র, সাঁতার শেখানো ও প্রাথমিক চিকিৎসা।
শিশুদের জন্য দিবাযত্ন কেন্দ্রের দরকার কোথায়? এ প্রশ্নের উত্তর মিলবে হেলথ অ্যান্ড ইনজুরি সার্ভের তথ্যে। তারা বলছে, দেশের শিশুর ডুবে মৃত্যুর ৬০ শতাংশ ঘটে সকাল ৯টা থেকে বেলা ১টার মধ্যে। তাই সেই সময়ে শিশুকে যদি নিরাপদ আশ্রয়ে রাখা যায়, তবে শিশুর মৃত্যু রোধ করা যায়।
শিশুমৃত্যু রোধের ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বেসরকারি সংগঠন সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ (সিআইপিআরবি)। প্রতিষ্ঠানটি ২০০৫ সাল থেকে শিশুমৃত্যু রোধে কাজ করে আসছে। ডব্লিউএইচওর তিন ধরনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা সিআইপিআরবির অভিজ্ঞতা থেকেই নেওয়া।
সিআইপিআরবি প্রথমে সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ, নরসিংদীর মনোহরদী এবং শেরপুর সদর উপজেলায় কাজ শুরু করে। এরপর ক্রমান্বয়ে চাঁদপুর সদর, মতলব উত্তর, মতলব দক্ষিণ, কুমিল্লার দাউদকান্দি, পটুয়াখালীর কলাপাড়া এবং বরগুনার বেতাগী ও তালতলী উপজেলায় তাদের কাজ সম্প্রসারিত হয়। সিআইপিআরবি এসব উপজেলায় একটি করে দিবাযত্ন কেন্দ্র তৈরি করেছে।
এখন সারা দেশের ১০ উপজেলার ৩ হাজার ২০০টি কেন্দ্রে প্রায় ৮০ হাজার শিশুকে দিবাযত্ন কেন্দ্র বা আঁচলে রাখা হয়। তারা সকাল নয়টার সময় আসে, চলে যায় বেলা দুইটায়। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একজন নারী শিশুদের দেখভাল করেন। তিনি ‘আঁচল মা’ নামে পরিচিত। প্রতিটি কেন্দ্রে তাঁদের একজন সহযোগী থাকেন। অথচ এসব সম্পর্কে মানুষ এখনো একেবারেই উদাসীন। জানেন না এমন একটি সেবা কার্যক্রম দেশে আছে।
অসংখ্য পুকুরসমৃদ্ধ গ্রাম অঞ্চলগুলো এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপ্রবণ। অনেক জায়গায় এক সারি বাসস্থানের কয়েকটি পরিবারের জন্য একটি পুকুর থাকে। এতেও বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। এই বয়সের শিশুদের সাঁতারও শেখানো যায় না এবং বিপদ ও নিরাপত্তা সম্পর্কে সুষ্ঠু ধারণাও তাদের মাঝে বিকশিত হয় না।
বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং তা সারা বিশ্বের নজরে এসেছে। জাতিসংঘের ঘোষণা অনুযায়ী এখন ‘পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক দিবস’ পালিত হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার এই দিবসটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে পালন করে আসছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *