চাঁদপুর শহর ভাঙনের হুমকিতে

দেশের প্রাচীনতম বাণিজ্য নগরী ও অন্যতম নৌ-বন্দর চাঁদপুর জেলা শহর নদী ভাঙনের হুমকিতে। প্রতি বছর শহর রক্ষা বাঁধের বিভিন্ন এলাকায় ভাঙনের ঘটনা ঘটছে। জরুরী ভিত্তিতে কিছু কাজ করা হলেও স্থায়ী প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে না। এ অবস্থায় চাঁদপুর শহর রক্ষায় নদীতে পরিকল্পিত ড্রেজিং ও স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি শহরবাসীর। স্থানীয় সংসদ সদস্য ও শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির নির্দেশে এ সংক্রান্ত একটি বড় ধরণের প্রকল্প প্রস্তুত করেছে স্থানীয় পাউবো। সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে স্থায়ী প্রকল্প বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়েছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম।

চাঁদপুর শহরের অদূরে উত্তর-পশ্চিম দিকে পদ্মা ও নদীতে বেশ কয়েকটি চর-ডুবোচর জেগেছে, ওইসব এলাকা একসময় মূল শহরের অন্তর্ভুক্ত ছিল। নদী ভাঙনে বিলীন হওয়ার কয়েক দশক পর সেখানে আবার চর-ডুবোচর জেগে উঠেছে। এসব চর স্থানীয়ভাবে ‘মিনি কক্সবাজার’ নামে পরিচিত। চরের কারণে পদ্মা-মেঘনা নদীর পানি প্রবাহে বিঘ্ন হচ্ছে। চর-ডুবোচরে নদীর গতিপথ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় পানি ও স্রোতের চাপ পড়ছে চাঁদপুর শহর রক্ষা বাঁধে। এ অবস্থায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শহর রক্ষা বাঁধ অনেক হুমকিতে আছে।
স্থানীয় লোকজন জানান, প্রতি বছর বর্ষায় মেঘনা নদীতে ভাঙন দেখা দিলে ভাঙনরোধে গ্রহণ করা হয় অস্থায়ী ব্যবস্থা। এতে সরকারের কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও বাঁধ রক্ষায় আসেনি স্থায়ী সমাধান।

তারা আরো জানান, মেঘনা নদীতে নতুন করে ভেসে ওঠা চরটি দৈর্ঘে প্রায় তিন কিলোমিটার। শীত মৌসুমে চরটি ভেসে থাকলেও বর্ষায় ডুবে যায়। নদীর সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি শীতের সময়ে চাঁদপুরসহ আশপাশের জেলা থেকে অনেকে চরে বেড়াতে যান। এই চরই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে চাঁদপুর শহররক্ষা বাঁধের জন্য।

পুরানবাজার শহররক্ষা বাঁধ এলাকার বাসিন্দারা জানান, গত ২০১৯ সাল থেকে ভাঙনে অন্তত শতাধিক মানুষ হারিয়েছেন তাদের বাসস্থান। এভাবে চলতে থাকলে অচিরেই মেঘনায় বিলীন হবে এ বাঁধ। স্থানীয় বাসিন্দা শাহ আলম বলেন, প্রতি বছর বর্ষার আগে, বর্ষা মৌসুমে এবং বর্ষা শেষে পুরানবাজারে শহর রক্ষা বাঁধে একাধিকবার ভাঙন বা বাঁধ ধ্বসে পড়ার ঘটনা ঘটে। প্রতিবছর কিছু কিছু এলাকা নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। আমাদের একটাই দাবি, অতি দ্রুত যেন শহর রক্ষা বাঁধের স্থায়ীভাবে সংস্কার করা হয়।
এদিকে চাঁদপুর শহর রক্ষায় প্রয়োজনীয় ড্রেজিংসহ স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের জোরালো দাবি জানিয়েছেন নদীভাঙন প্রতিরোধ সংগ্রাম কমিটির দক্ষিণাঞ্চল শাখার নেতৃবৃন্দ। ক’দিন পরপর থোক বরাদ্দ আর বালু ভর্তি জিইও টেক্সটাইল ব্যাগ নদীতে ফেলে প্রমত্তা মেঘনার ভাঙনরোধ করা যাবে না বলেও নেতৃবৃন্দ অভিমত ব্যক্ত করেন। সংগঠনের সভাপতি ফয়েজ আহমেদ ভূঁইয়া বলেন, আমরা দীর্ঘদিন যাবত দাবি জানিয়ে আসছি চাঁদপুর শহর রক্ষায় স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের। কিন্তু পানি উন্নয়ন বোর্ড তা গ্রাহ্য না করে, যখন ভাঙন প্রক্রিয়া শুরু হয় তখন তড়িঘড়ি করে বালুভর্তি জিইও টেক্সটাইল বস্তা নদীতে ফেলে ভাঙন প্রতিরোধের চেষ্টা করেন। এ যেন ঝিনুক দিয়ে সমুদ্রে সেচ দেওয়ার মত অবস্থা।

তিনি আরো বলেন, নদীর পানি চলাচলের স্বাভাবিক গতিপথ অবরুদ্ধ করে, নদীর পাড়ে বস্তা ফেলে নদীর তীর রক্ষা করা যাবে না। এজন্য সঠিক সার্ভের মাধ্যমে, নদীর চলাচল স্বাভাবিক রাখার লক্ষে, মেঘনার বুকে জেগে থাকা অদৃশ্যমান ডুবো চর, ড্রেজিং এর মাধ্যমে কেটে দিতে হবে।

চাঁদপুর চেম্বারের সহ-সভাপতি তমাল কুমার ঘোষ বলেন, ব্রিটিশ আমল থেকেই পুরানবাজার ঐতিহ্যবাহী একটি ব্যবসা কেন্দ্র। বিভিন্ন সময়ে নদী ভাঙনের কবলে পড়ে বাজার অনেকটাই এখন বিলুপ্তির পথে। ভাঙনরোধে অচিরেই শহররক্ষা বাঁধের স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাই। পাশাপাশি শহরের অদূরের চরগুলো কেটে ফেলা দরকার।

এ বিষয়ে চাঁদপুর সরকারি কলেজের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, বড়স্টেশন মোলহেড এলাকায় মেঘনার মধ্যখানে চর জেগে ওঠায় নদী সংকুচিত হয়ে গেছে। এর উত্তর পাশে নদীর প্রশস্ততা অনেক। এতে বর্ষায় পানির চাপ বেড়ে পাড়ে ঘূর্ণির সৃষ্টি হয়ে ভাঙন দেখা দেয়। চরটি পরিকল্পিত খননের পাশাপাশি শহররক্ষা বাঁধ স্থায়ীভাবে সংস্কার করা অত্যন্ত জরুরি। তা না হলে চাঁদপুর শহর বড় ধরনের ভাঙনের মুখোমুখি হতে পারে।

চাঁদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানায়, শহর বাঁধ টিকিয়ে রাখতে জরুরী ভিত্তিতে চর খননের পাশাপাশি বাঁধের স্থায়ী সংস্কার প্রয়োজন। তা না হলে চাঁদপুর শহর মেঘনায় তলিয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। মাঝ নদীতে ‘মিনি কক্সবাজার’ জেগে ওঠায় সংকুচিত হয়ে গেছে মেঘনা। বর্ষা মৌসুমে ভাটির দিকে উজান থেকে নেমে আসা পানি প্রবাহে দেখা দিচ্ছে সমস্যা। পানির চাপে শহররক্ষা বাঁধ এলাকায় নদী গভীর থেকে আরও গভীর হচ্ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে ঘূর্ণিস্রোত ও ঢেউ। এতে ঝুঁকিতে পড়েছে চাঁদপুর শহর।

সূত্র আরো জানায়, ধীরে ধীরে চর বিস্তৃত হওয়ার পাশাপাশি বাঁধ এলাকায় বাড়ছে মেঘনা নদীর গভীরতা। বাঁধ এলাকায় মেঘনা নদীর গভীরতা সর্বোচ্চ ৫৭ মিটার পর্যন্ত। শিগগির মেঘনার বুকে নতুন করে জেগে ওঠা চর পরিকল্পিতভাবে খননের পাশাপাশি শহর রক্ষা বাঁধের স্থায়ী সংস্কারের উদ্যোগ না নিলে ভাঙনের কবলে পড়তে পারে চাঁদপুর শহর।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, চাঁদপুর শহর ভাঙনরোধে ১৯৭২ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ১৪০ কোটি ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে নতুন বাজার এলাকায় ১৭৩০ মিটার শহররক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়। পরে ২০০৯-২০১০ সালে আরও প্রায় ২৪ কোটি ৯০ হাজার টাকা ব্যয়ে পুরান বাজার এলাকার ১৬৩০ মিটার এলাকায় বাঁধ নির্মাণ করা হয়। এরপর থেকেই বদলাতে থাকে ভাঙনের চিত্র। চাঁদপুরের মানুষ ফিরে পায় স্বস্তি। কিন্তু বাঁধ নির্মাণের পর দীর্ঘ সময় পার হলেও তা রক্ষায় নেয়া হয়নি কোন স্থায়ী উদ্যোগ।
একই সূত্রেই দেওয়া তথ্য মতে, গত ২০১৯ ও ২০২০ সালে চাঁদপুর শহরের পুরানবাজার হরিসভা এলাকায় একাধিকবার ভাঙনের শিকার হয়েছে শহররক্ষা বাঁধটি। এতে ৬৭ মিটার এলাকা নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে। বাঁধ রক্ষায় অস্থায়ীভাবে কাজ হয়েছে কয়েক কোটি টাকার। এর মধ্যে ২০১৭-১৮ সালে ৫৮ মিটার সংস্কার কাজে ব্যয় হয় ২৮ লাখ টাকা, ২০১৮-১৯ সালে ৪৮৫ মিটার সংস্কার কাজে ব্যয় হয় ২ কোটি ২৯ লাখ টাকা এবং ২০১৯-২০ সালে ৩২৪ মিটার সংস্কার কাজে ব্যয় হয় ১ কোটি ১১ লাখ টাকা।

চাঁদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী রেফাত জামিল বলেন, ২০০৯-২০১০ সালের পর বাঁধের স্থায়ী সংস্কার কাজ হয়নি। পরে বাপাউবো গঠিত কারিগরী কমিটির অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী ৪২০ কোটি টাকার একটি স্থায়ী রক্ষণাবেক্ষণ প্রকল্প তৈরি করে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়।

তিনি বলেন, গত মার্চে মন্ত্রণালয়ে যাচাই কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত হয়, তিন নদীর সংযোগে চাঁদপুর শহরের হাইড্রো-মরফোলজিক্যাল অবস্থা পর্যালোচনা করে বিস্তারিত সমীক্ষার প্রস্তাব পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এর আগে গত বছর ২৭ আগস্ট বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আতাউর রহমান, আইডব্লিউএমের প্রিন্সিপাল সারওয়াত জাহানসহ বিভিন্ন দপ্তরের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি কমিটি করা হয়। কমিটি একটি সমীক্ষা প্রতিবেদন দেয়।

ওই প্রতিবেদনের আলোকে চলতি বছরের জানুয়ারিতে তিন হাজার ১০৩ কোটি ২ লাখ টাকার চাঁদপুর শহর সংরক্ষণ পুনর্বাসন প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া হয়। মন্ত্রণালয়ে যাচাই কমিটি চলতি বছরের ৪ মার্চ আবার সম্ভাব্যতা সমীক্ষার মাধ্যমে প্রকল্পের পরিধি এবং কারিগরি বিষয় চূড়ান্ত করার পরামর্শ দেয়। সব কাজ শেষ করে আবারও তা ২ জুন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী রেফাত জামিল বলেন, শহররক্ষা বাঁধ টিকিয়ে রাখতে হলে জরুরি ভত্তিতে নদীর মাঝে জেগে ওঠা চর খনন করে মেঘনার গতিপথ ঠিক করতে হবে। পাশাপাশি শহর রক্ষা বাঁধের স্থায়ী সংস্কার প্রয়োজন। তা না হলে শহররক্ষা বাঁধ বিলীন হয়ে চাঁদপুর শহর তলিয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম অতি সম্প্রতি চাঁদপুর সফরে শহর রক্ষা বাঁধ পরিদর্শন করেন। সে সময় সাংবাদিকদের সাথে মতিবিনময়কালে তিনি বলেন, চাঁদপুর শহর রক্ষায় বড় ধরনের প্রকল্প দরকার। ছোট ছোট প্রকল্প নিয়ে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। তাই আমরা চাচ্ছি একটি স্থায়ী প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। পাউবো’র একটি প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে এখন। এরপর প্রাপ্ত রিপোর্ট ও সুপারিশের আলোকে স্থায়ী প্রকল্প গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি চাঁদপুর শহর রক্ষায় শহরের অদূরে নদীতে জেগে ওঠা চর-ডুবোচরগুলো কেটে ফেলা হবে। তখন নদীর গতিপথ স্বাভাবিক হলে চাঁদপুর শহরে ভাঙনের ঝুঁকি আর থাকবে না।

শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি অতি সম্প্রতি চাঁদপুরের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সাথে মতবিনিময়কালে বলেন, চাঁদপুর শহর রক্ষায় স্থায়ী প্রকল্প গ্রহণ করার জন্য ইতিপূর্বে আমি কয়েক দফায় পাউবো কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দিয়েছি। আমার পরামর্শ ও নির্দেশনার আলোকে ইতিমধ্যে পাউবো একটি বড় ধরণের প্রকল্প প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। প্রকল্পটির সরকারের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে। আশা করছি, এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা গেলে নদী ভাঙন থেকে স্থায়ীভাবে রক্ষা পাবে চাঁদপুর শহর।

সময় ডেস্ক

Leave a Reply

Your email address will not be published.