জাতি ২০০৯ সালের পুনরাবৃত্তি চায় না : প্রধানমন্ত্রী

স্টাফ রিপোর্টার
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘যে কোনও বাহিনীর জন্য মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে শৃঙ্খলা ও চেইন অব কমান্ড। কখনও শৃঙ্খলার ব্যাঘাত ঘটাবেন না। অর্পিত দায়িত্ব মেনে চলবেন, চেইন অব কমান্ড মেনে চলবেন।’ মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর পিলখানায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) দিবস-২০২২ এর অনুষ্ঠানে এ বাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশ্যে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন।
এর আগে সকাল ১০টায় পিলখানায় বিজিবি সদর দফতরের বীরউত্তম আনোয়ার হোসেন প্যারেড গ্রাউন্ডে উপস্থিত হলে তাকে স্বাগত জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আমিনুল ইসলাম খান এবং বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল সাকিল আহমেদ। এরপর বিজিবির কুচকাওয়াজ পরিদর্শন শেষে বিজিবি সদস্যদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের সরকার গঠনের মাত্র ৫২ দিনের মাথায় ২০০৯ সালে একটি দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটে (তৎকালীন বিডিআর হত্যাযজ্ঞ)। পুরো জাতি এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখতে চায় না।’ প্রধানমন্ত্রী ওই ঘটনায় শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে বলেন, ‘একটা কথা মাথায় রাখবেন, কখনো শৃঙ্খলার ব্যাঘাত ঘটাবেন না। অর্পিত দায়িত্ব মেনে চলবেন। চেইন অব কমান্ড মেনে চলবেন।’
তিনি বলেন, ‘এই দেশ আমাদের, দেশ যত উন্নত হবে আপনাদের পরিবারই ভালো থাকবে, সুস্থ থাকবে। উন্নত জীবন পাবে, শিক্ষা-দীক্ষা, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানসহ সব ধরনের সুযোগ পাবে। সে কথা সবসময় মনে রাখতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘বর্ডার গার্ড আইন ২০১০ পাসের পর এই বাহিনীকে আমরা আধুনিক ও যুগোপযোগী করে গঠন করেছি। আমার বিশ্বাস আধুনিক সীমান্তরক্ষী বাহিনী হিসেবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে তার লক্ষ্য অর্জনে।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার বিজিবির সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিজিবি পুনর্গঠনের আওতায় ব্যাপক উন্নয়নমূলক কাজ করে যাচ্ছে। ফলে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ একটি দক্ষ, শক্তিশালী আধুনিক ও ত্রিমাত্রিক বাহিনী হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে।
সরকার প্রধান বলেন, ‘যেকোনো পেশাদার বাহিনীর জন্য প্রশিক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি সুশৃঙ্খল ও দক্ষ বাহিনীর জন্য প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই। বিজিবি সদস্যদের উন্নত প্রশিক্ষণের জন্য সাতকানিয়ার ‘বর্ডার গার্ড ট্রেনিং সেন্টার অ্যান্ড কলেজ’র পাশাপাশি চুয়াডাঙ্গায় আরও একটি প্রশিক্ষণ সেন্টার স্থাপনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের ২২৭ বছরের ঐতিহ্যবাহী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাহিনীর গৌরবময় ভূমিকা ছিল স্বাধীনতার যুদ্ধে। বঙ্গবন্ধুর ডাকে তৎকালীন ইপিআর পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। জাতির পিতার স্বাধীনতার ঘোষণা তৎকালীন ইপিআর এই পিলখানা থেকে সারা বাংলাদেশে প্রচার করেছিল। সুবেদার মো. শওকত আলীসহ তার সঙ্গী চারজন নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জাতির পিতার ভাষণ সমগ্র বাংলাদেশে পৌঁছে দিয়েছিল। পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর কাছে সুবেদার শওকত আলীসহ চার জন ধরা পড়ার পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি, শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সহমর্মিতা জানাই। বাংলাদেশ স্বাধীনতার যুদ্ধে বাংলাদেশ বিজিবি বাহিনীর সদস্যদের বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতার যুদ্ধে ১২ হাজার সদস্য অংশ নিয়েছিল। তাদের মধ্যে দুজন বীরশ্রেষ্ঠ, ৮ জন বীর উত্তম, ৩২ জন বীর বিক্রম, ৭৭ বীরপ্রতীক পদকে ভূষিত হন। এতো বেশি পদক বোধহয় আর কোনো বাহিনী পায়নি। মহান মুক্তিযুদ্ধে ৮১৭ জন সদস্য আত্মাহুতি দিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা যেভাবে দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে চেয়েছিলেন, আজ আওয়ামী লীগ সরকার সেই পদক্ষেপই নিয়েছে। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পাশাপাশি গৃহহীন-ভূমিহীনদের বিনা মূল্যে ঘর এবং জীবন-জীবিকার ব্যবস্থা করে দিচ্ছে। কারণ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের দেশে একটি মানুষও ভূমিহীন-গৃহহীন থাকবে না, ইনশাল্লাহ। আমরা সেভাবেই কাজ করে যাচ্ছি। প্রতিটি মানুষের জন্য একটা ঠিকানা গড়ে দেয়ার পাশাপাশি সবার হাতে আজ মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট সার্ভিস, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণ, ফ্রিল্যান্সিং, তরুণ প্রজন্মের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সর্বক্ষেত্রে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি।’
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞা-পাল্টানিষেধাজ্ঞার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের দেশে যাতে মন্দা না আসে, সে জন্য আমাদেরই তার ব্যবস্থা নিতে হবে। কারো কাছে হাত না পেতে নিজেদের খাদ্য উৎপাদন করে আমরা নিজেরা নিজেদের মতোই চলব, মাথা উঁচু করে চলব। এ কারণেই আমি আহ্বান করেছি- এক ইঞ্চি জমিও যেন অনাবাদি পড়ে না থাকে, প্রতিটি ইঞ্চিতে যে যা পারেন তা উৎপাদন করবেন।’
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশ-ভারত পার্বত্য সীমান্তের নিরাপত্তা বৃদ্ধি, দুর্গম এলাকায় বসবাসকারী জনসাধারণের আর্থসামাজিক উন্নয়নের প্রয়োজনে ১ হাজার ৩৬ কিলোমিটার সীমান্ত সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। যার মধ্যে এতে ৫৩৯ কিলোমিটার অরক্ষিত সীমান্তের মধ্যে ৪০২ কিলোমিটার সীমান্ত নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। এছাড়া আরও ২৪২টি নতুন বিওপি সৃজন এবং সীমান্ত হতে অধিক দূরত্বে স্থাপিত ১২৬টি বিওপি সীমান্তের সন্নিকটে স্থানান্তরের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
বর্তমান সরকার সৈনিকদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন ধরনের কল্যাণমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে উল্লেখ করে সরকারপ্রধান বলেন, নতুন র‌্যাংক ব্যাজ প্রবর্তন, যোগ্যতার ভিত্তিতে বিভাগীয় অফিসার পদে পদোন্নতি, সীমান্ত ভাতা প্রদান এবং জুনিয়র কর্মকর্তা ও হাবিলদার পদবির সদস্যদের বেতন স্কেল উচ্চ ধাপে উন্নীত করা হয়েছে। এ ছাড়া ২ মাসের বাৎসরিক ছুটি ও অগ্রিম বেতন প্রদান, পারিবারিক রেশন, তিন বছরের নিচে সন্তানদের পূর্ণ স্কেল রেশন প্রদানসহ বিজিবি সদস্যদের প্রতিবন্ধী সন্তানদের অবসরের পূর্বপর্যন্ত নগদ মূল্যে রেশন প্রদান করা হচ্ছে। পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটনির্ভর ভি-স্যাট প্রযুক্তির মাধ্যমে টেলিফোন সুবিধা সম্প্রসারণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে জনবিচ্ছিন্ন বিওপিতে আইপি ফোনের মাধ্যমে যোগাযোগের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হচ্ছে।
পিলখানায় আয়োজিত এ বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী। বিশেষ করে নারী সৈনিকদের কুচকাওয়াজে মুগ্ধতা প্রকাশ করেন। প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত বিজিবি সদস্যদের মধ্যে কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বিজিবি পদক, রাষ্ট্রপতি বিজিবি পদক, বিজিবি পদক-সেবা এবং ২০২২ সালের রাষ্ট্রপতি বিজিবি পদক-সেবা বিতরণ করেন। পরে তিনি বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান প্রত্যক্ষ করার পর প্রধানমন্ত্রী ‘বিজিবি দিবস-২০২২’-এর বিশেষ দরবারেও অংশগ্রহণ করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *