জ্বালানী তেলের দাম নিয়ে সঙ্কটের দ্রুত সমাধান প্রয়োজন

জ্বালানী তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে দেশের পরিবহন গেক্টরে যে সঙ্কট দেখা দিয়েছে তা দ্রুত নিরসন হওয়া দরকার। কারণ পরিবহনের কারণে দেশের সাধারন মানুষকে অনেক দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বলতে গেলে দেশে অঘোষিত একপ্রকার অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এতে দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব পড়ছে যে তাকে কোন সন্দেহ নেই।

সরকারের উচিত জ্বালানী তেল নিয়ে যে সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে তার সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। যদি জ্বালানী তেলের দাম কমিয়ে আনা যায় তা বিবেচনা করা আর যদি কমানো না যায় তাহলে পরিবহনগুলো কিভাবে চলতে তা নির্ধারণ করে দেয়া দরকার। হুট করে পরিবহনের ভাড়া কয়েকগুণ বাড়ানো হলে যাত্রীদের মধ্যে কতটা বিরূপ প্রভাব পড়বে তাও ভেবে দেখতে হবে।
এর জন্য পরিবহনগুলো যাতে ভাড়া বৃদ্ধির ক্ষেত্রে অস্বাভাবিকতা না করেন সেই জন্য পরিবহন সেক্টরের সাথে আলোচনা করে ভাড়া নির্ধারণ করে দেয়া অপরিহার্য।

গত সাত বছরে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন-বিপিসি প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা মুনাফা করেছে। বিপিসির লাভ যখন লিটারপ্রতি ১৫-৪০ টাকা ছিল, তখন বহু সমালোচনার পর এপ্রিল ২০১৬ সালে মাত্র ৩ টাকা কমানো হয়েছিল।

এরপর ডিজেল-কেরোসিনের দাম বাড়ানোর সুযোগ না পেয়ে কয়েকবার বাড়ানো হয়েছে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম। এখন আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণে প্রতি লিটার ডিজেলে ১৩ টাকা লোকসান দেখিয়ে এক ধাক্কায় ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বাড়িয়ে ৬৫ টাকা থেকে ৮০ টাকা করা হলো। সাত বছর ধরে গড়ে ২৩ শতাংশের বেশি লাভের বিপরীতে কমানো হয়েছিল মাত্র সাড়ে ৪ শতাংশ। অথচ পাঁচ মাসের লোকসান দেখিয়ে ডিজেল-কেরোসিনের দাম এক লাফে ২৩ শতাংশ বাড়ানো কি গ্রহণযোগ্য হলো?

সরকার বিপিসিকে ভর্তুকি দেয়, তবে বিপিসির কাছ থেকে শুল্ক, কর, ভ্যাট বা মূসক বাবদ আয়ও করে। লোকসানের হিসাবটা সরল নয়। লিটারপ্রতি ডিজেলে ১১ টাকা ভ্যাটসহ অন্যান্য শুল্ক প্রায় ১৭ টাকার বেশি। প্রাথমিক জ্বালানির ওপর ২৫ শতাংশের বেশি শুল্ক-মূসক আদায় অর্থনৈতিক দিক থেকে আত্মঘাতী নয় কি? সরকারের আয় বাড়াতে পণ্য উৎপাদন খরচ এবং ব্যবসা সহজীকরণের প্রাথমিক ভিত্তিতেই বাধা তৈরির যৌক্তিকতা কোথায়?

গত সাত বছরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল- গ্যাসের মূল্য যখন নিম্নমুখী ছিল, তখন সরকারের বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ানোর যুক্তি কি সঠিক ছিল? তরল প্রাথমিক জ্বালানির আন্তর্জাতিক মূল্য নিম্নমুখী থাকার সময় সেকেন্ডারি জ্বালানির দাম উপর্যুপরি বাড়ানো হয়েছিল কেন? আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম কম থাকলে বিদ্যুতের দাম বাড়বে, বেশি হলে প্রাইমারি জ্বালানির দাম বাড়বে—এটা কি ব্যবসা ও জনবান্ধব কৌশল?

২৩ শতাংশের মতো অসহনীয় হারে দাম বাড়ানোয় জনজীবনে অসহনীয় চাপ শুরু হবে। পত্রিকায় শিরোনাম উঠেছে, ‘দামে দিশেহারা ক্রেতা’, ‘এখন সংসার চালানোই দায়’। এসব প্রতিবেদনের পূর্বাপর মূল্য বিশ্লেষণ করে প্রতীয়মান হয়েছে যে মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের ওপর। কৃষি ও শিল্পের উৎপাদন জ্বালানির সঙ্গে পরস্পর সংযুক্ত। এতে পণ্য মূলের ক্রয়ক্ষমতার হিসেবে মানুষের বেতনের টাকার অবমূল্যায়ন ঘটবে। অর্থাৎ করোনার পর মানুষের আয়ের ক্রয়ক্ষমতা আরেক দফা কমে যাবে। এমনিতেই বেকারত্ব, নতুন দারিদ্র্যে সাধারণ মানুষ কষ্টে আছে। নিম্নবিত্ত এবং প্রান্তিক মানুষের ক্ষুধার কষ্টও শুরু হয়েছে। জ্বালানি তেল ও রান্নার গ্যাসের দাম সহনীয় হারে না বাড়িয়ে ‘অতি উচ্চহারে’র বৃদ্ধি বড্ড অযৌক্তিক ও গণবিরোধী।

কাজী মোহাম্মদ ইব্রাহীম জুয়েল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *