নারীর প্রতি সহিংসতা দূর করতে হবে: শিক্ষামন্ত্রী

ঢাকা অফিস শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেন, নারী সবচেয়ে বেশি দায়িত্বশীল। রান্না, সেলাই, ধর ধোয়ামোছা এসকল কাজের ক্ষেত্রে নারী, আর অর্থপ্রাপ্তি যোগ হয় এমন কাজে পুরুষ, এটা সমাজের তৈরি করা নিয়ম। ৭২-এর সংবিধানে নারীর সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আজ যারা নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে কাজ করেন, সেখানেও ক্ষমতায়নে নারীর অবস্থান তৈরি হয়নি। এটি সত্য আমাদের প্রধানমন্ত্রী, সংসদ উপনেতা, স্পিকার, বিরোধীদলীয় নেতা নারী। অথচ সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় নারীর অবস্থান এখনও কম। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এত বিশাল। আমি মন্ত্রী নারী। মাঠ পর্যায়ে অনেক শিক্ষক আছেন নারী। কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় নারী খুব কম।

তিনি বলেন, ১৯৯৭ সালের নারী নীতিমালা একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। ১৯৯৭ সালের নারী নীতির মৌলিক কতগুলো বিষয় ছিল। সম্পত্তিতে নারীর সমান অধিকারসহ বিভিন্ন মৌলিক বিষয় ছিল। কিন্তু ২০০৫ সালে রাতের অন্ধকারে সেই নারী নীতিকে ছিঁড়ে-খুঁড়ে একেবারে ধ্বংস করে দেওয়া হলো। কারণ, তখন যে সরকার, সেই সরকারের মূল অংশে ছিল একটি মৌলবাদী দল। মূল দলটিও নারী বিদ্বেষী, তার যথেষ্ট প্রমাণও আছে। নারী নীতিটাকে পাল্টে ফেলার পর যেটা হলো—আবার যখন ২০১১ সালে নারী নীতিটি করলাম, তখন মৌলিক যে পরিবর্তন আনা হয়েছিল, আমাদের রাজনীতির যে চেহারা এতখানি পাল্টে গেলো; আমরা ১৯৯৭ সালের নীতিমালার মৌলিক জায়গায় ফিরে যেতে পারিনি। কিন্তু আমাদের ওই জায়গায় যেতে হবে।
বৃহস্পতিবার (১০ মার্চ) আগারগাঁওয়ে পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশনে (পিকেএসএফ) নারী দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভায় দীপু মনি আরো বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতা দূর করতে হবে। সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় রীতিনীতিতে একজন নারীকে অনেক বেশি ‘না’ শিখতে হয়। এমনকি জোরে হাসলেও যেন একটি অপরাধ। এত বেশি না না শুনতে শুনতে একজন নারীর চারপাশে একটি শক্ত দেয়াল তৈরি হয়। এটি ভেঙে বের হওয়াই তো একজন নারীর জন্য শক্ত যুদ্ধ। অধিকাংশ মেয়ে দেয়ালটা ভেঙে বের হতে পারে না। দেয়ালটাকে ভাঙার জন্য নারীকে সাহস জোগাতে হবে। নারীকে তার অন্তর্নিহিত শক্তিটাকে উপলব্ধি করতে হবে। সেই শক্তি দিয়ে নারীকে সব জয় করতে হবে।
রাজনীতি প্রসঙ্গে দীপু মনি বলেন, যে রাজনীতি নারীর পক্ষে, মানুষের পক্ষে, মানবাধিকারের পক্ষে, সেই রাজনীতি বেছে নিতে হবে। যারা যুদ্ধাপরাধ করেছে, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করেছে, নারী নির্যাতন করেছে, যারা সেই অপরাধীকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়; নারীর অধিকার লঙ্ঘন করার সব কায়দা-কানুন তাদের মাধ্যমেই হবে। তাহলে নারী কেন তাদের সমর্থন দেবে? সমর্থন দেওয়া উচিত নয়। যারা প্রগতির কথা ভাবেন, তাদেরও সেই রাজনীতিকে প্রশ্রয় দেওয়ার কারণ নেই। নারীর অধিকার তো রাজনৈতিক বিষয়।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, সকাল বেলা কল চালালে পানি আসে; এটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়। আমার বাচ্চাটি স্কুলে পড়তে যায়; সেটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়। আমার খাবার আসে সেটিও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফল। অনেকের মধ্যে এ রকম ধারণা আছে—“আমি রাজনীতিতে থাকি না বাবা”। কিন্তু আমরা যা কিছু করছি, তার সব সিদ্ধান্তই নিচ্ছে রাজনীতি। আমি যদি রাজনীতি থেকে নিজেকে দূরে রাখি, যদি ভাবি আমি ওর কাছে যাবো না। তার মানে হচ্ছে, আমি আমার দায়িত্ব পালন করছি না। আমি সচেতন না। তবে সবাইকে রাজনৈতিক দল করতে হবে এমন না। তবে রাজনীতি সচেতন হতে হবে। দেশের অর্ধেক জনসংখ্যা নারী। সেই নারীকে নিজের স্বার্থে, শতভাগ জনগণের স্বার্থে; সেই রাজনীতিকে চেছে নিতে হবে, যে রাজনীতি নারীর পক্ষে, মানুষের পক্ষে। যে রাজনৈতিক দল অসাম্প্রদায়িক সেই রাজনীতিকেই বেছে নিতে হবে। আজ ২০২২ সালের যে বাংলাদেশ পেয়েছি, তা এগিয়ে নিতে হবে বহু দূর। ধর্ষণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একজন নারীকে বন্যপশু আক্রমণ করলে তার সম্ভ্রম যায় না, তাহলে মানুষরূপী পশু আক্রমণ করলে তার সম্ভ্রম কেন যাবে? ধর্ষণের ঘটনায় ধর্ষিতা নয়, ধর্ষকের সম্ভ্রমহানি হওয়ার কথা।
দীপু মনি বলেন, সম্ভ্রম তো কোনো নারীর কোনো বিশেষ অঙ্গে বাস করে না। সম্ভ্রম যদি কারো যায় তাহলে মানুষরূপী যে পশুটি তাকে আক্রমণ করেছে তার সম্ভ্রমহানি হয়েছে। একজন নারী কেন ধর্ষিতা হয়, তার জীবন নষ্ট হয়ে যায়, কেন সে সমাজে মুখ দেখাতে পারবে না, কেন আইনের কাছে গেলে বার বার তাকে আরও ভিকটিমাইজ করা হবে। কেন আমরা মনে করব তার জীবনটাই শেষ হয়ে গেল!’
তিনি বলেন, ধর্ষণের শিকারকে অন্য যে কোন অপরাধের শিকার হবার মতো মনে করতে হবে। ধর্ষণকে আমরা সম্ভ্রমের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ করে ফেলেছি। নারীদের এত পিছিয়ে থাকার বড় কারণ সহিংসতা ও পদে পদে ধর্ষণের ভয়। ধর্ষণের সঙ্গে নারীর সম্ভ্রমকে এক করে দিয়েছি। আমার কাছে মনে এই জায়গাটা খুব গোলমেলে।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে। পৃথিবীতে সব জায়গায় ঘটছে, ঘটা উচিত নয়। তারপরও ঘটছে, নানান কারণে ঘটছে। সেই কারণ বিশ্লেষণের এখানে সময়ও নেই, এটি জায়গাও নয়। কিন্তু সেটি ঘটলে কেন নারীর সম্ভ্রম যাবে এই একটি মাত্র ধর্ষণের একটি ঘটনা বা দুর্ঘটনা অপরাধ সে অপরাধ, যে অপরাধ নারীর বিরুদ্ধে সংঘটিত হয়। সেই অপরাধে কেন অপরাধীর নয়, অপরাধের শিকার নারীর জীবন নষ্ট হবে কেন?তিনি বলেন, সমাজের এই চিন্তার জায়গা যতক্ষণ না পরিবর্তন হবে ততক্ষণ নারী দিনে রাতে ঘরে বাইরে যেকোনো জায়গায় এই এক বিভীষিকার ভয় মাথার পেছনে নিয়ে নিয়ে তার পথ চলতে হবে। তার পথ চলতে প্রতিটি পদক্ষেপ অনেক ভারী। অনেক ভারী। তাকে প্রতি মুহূর্তে এই এক ভয়ের কথা মাথায় রাখতে হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published.