যেভাবে তৈরি হলো ‘নাসেক নাসেক’

‘নাসেক নাসেক’। এটি নিছক হাজং ভাষার স্বল্প পরিচিত বোল নয়; বরং কোক স্টুডিও বাংলার উদ্বোধনী সংগীত ঝংকার হিসেবেই গেঁথে গেছে সবার মনে। এই গানের লেখক অনিমেষ রায় হাজং সম্প্রদায়ের অসাধারণ প্রতিভাবান একজন সংগীতশিল্পী। ময়মনসিংহের ত্রিশালের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগীত বিষয়ে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়ছেন তিনি।
চারদিকে সাড়া ফেলে দেওয়া এই ‘নাসেক নাসেক’ গানের নেপথ্যের গল্প এবং আরও নানা দিক নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপচারিতায় যোগ দিয়েছিলেন দুই শিল্পী অনিমেষ রায় ও পান্থ কানাই। অনুষ্ঠানে সঞ্চালক ছিলেন আরেক সংগীতশিল্পী খৈয়াম সানু সন্ধি। এই আলোচনায় গীতিকার কবির বকুলও অংশ নিয়েছেন তাঁর প্রতিক্রিয়া জানাতে।

প্রথমেই ‘নাসেক নাসেক’ গানের প্রথম দুই চরণের সুরেই মাতিয়ে দিলেন অনিমেষ রায়। সঞ্চালকের প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে অনিমেষ জানান, সংগঠিত বর্ণমালা না থাকা আদি ও অকৃত্রিম নিজস্ব হাজং ভাষার গান সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার আজন্মলালিত আকাঙ্ক্ষার কথা। শায়ান চৌধুরী অর্ণব প্রথম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ও ভিডিও সাইটে সাড়া জাগিয়ে ভাইরাল হওয়া অনিমেষের গানের প্রতি আগ্রহী হন। পরে হাজং ভাষার গানটি অনিমেষ তাঁকে শোনালে তিনি দারুণ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। পান্থ কানাইয়ের কণ্ঠে আবদুল লতিফের লেখা ও সুরারোপিত কালজয়ী ‘দোল দোল দুলুনি’ গানটির সঙ্গে জুড়ে দিয়ে অদিত রহমানের সংগীত ও যন্ত্রসংগীত ব্যবস্থাপনায় ‘নাসেক নাসেক’ তৈরি করে এক নতুন ইতিহাস।

জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী পান্থ কানাই আয়োজনের অংশ হতে বেশ কিছুদিন ধরে দেশে কোক স্টুডিও আসার দোলাচলের মধ্যেও অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন।
যেভাবে তৈরি হলো নাসেক নাসেক

তিনি জানান, অনিমেষের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার আগেই তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দোতারার ধাঁচে ইউকেলেলে বাজিয়ে তাঁর বিভিন্ন লোকগান শুনে আগে থেকেই মুগ্ধ হয়েছিলেন।
আড্ডার এ পর্যায়ে গীতিকার কবির বকুল সঞ্চালকের প্রশ্নের জবাবে জানান, তিনি অন্য সবার মতোই কোক স্টুডিওর প্রথম পরিবেশনার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেছেন। অনিমেষের খোলা গলায় একেবারে স্বল্পপরিচিত এই হাজং ভাষার গানের প্রথম বোল ‘নাসেক নাসেক’ আর তাঁর অনন্যসাধারণ পরিবেশনের ভঙ্গি সূচনাতেই সবার বিস্ময় ও মুগ্ধতা অর্জন করেছে।

আর অনিমেষের উৎসবমুখর ‘নাসেক নাসেক’-এর সঙ্গে পান্থ কানাইয়ের কণ্ঠে চর্চিত ‘দোল দোল দুলুনি’ গানে গাঁয়ের বধূর মান ভাঙানোর আখ্যান, এই দুইয়ে মিলে এক অদ্ভুত সুন্দর সুরঝংকার তৈরি হয়েছে কোক স্টুডিও বাংলায়।

এই ‘নাসেক নাসেক’ গানে বর্ণিত গ্রামপ্রধান বা মোড়লেরা ফসল কাটার সময়ে খাবারদাবার আর নাচগানের আয়োজন করতেন। এমনকি মজাচ্ছলে ছেলেবুড়ো সবাই মিলে কাদা-মাখামাখি পর্যন্ত হতো।

সেই উৎসবমুখর আবহের গল্প শুনেছেন অনিমেষ পরিবারের প্রবীণদের কাছে। আর পান্থ কানাইয়ের স্বভাবসুলভ নেচে-গেয়ে মাতিয়ে তোলার ব্যাপারটির সঙ্গে অনিমেষও নানান নৃত্য ভঙ্গিমায় সেই উৎসবমুখর পরিবেশই যেন তুলে এনেছেন এই পরিবেশনায়। এ পর্যায়ে স্বল্প সময়ের পরিচয়েও এই দুই শিল্পীর পারস্পরিক বোঝাপড়া, আন্তরিকতা ও স্নেহ-শ্রদ্ধার সম্পর্কের কথাও উঠে আসে। সর্বশেষে কবির বকুলের অনুরোধে ‘নাসেক নাসেক’ গানের দ্বিতীয় অন্তরাটি আবার ইউকেলেলের সংগতে গেয়ে শোনান অনিমেষ উপস্থিত বাকি সবার অংশগ্রহণে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.