পদ্মা সেতুর বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সদস্য হাজীগঞ্জের ড. হোসাইন মো. শাহিন

স্টাফ রিপোর্টার অধ্যাপক হোসাইন মো. শাহিন জাপানে উচ্চ শিক্ষা লাভের পর সেখানে দশ বছর শিক্ষকতা করেন। এ সময় জাপানের বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন। এরপর দেশে ফিরে আসার পর কর্ণফুলীতে বঙ্গবন্ধু টানেল এবং পদ্মা সেতু নির্মাণ কাজেও বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেছেন।
পদ্মা সেতুর পাইল বসাতে গিয়ে নদীর তলদেশে নরম মাটির স্তর পাওয়া যায়। তখন দুটি পিলারের টপ সেকশনের কাজ বন্ধ রাখা হয়। সেই সমস্যা সমাধানে যুক্ত হন পদ্মা সেতু নির্মাণ কাজে। বিশেষজ্ঞ দলের একটি টিম ওয়ার্কের মাধ্যমে কয়েক মাসেই সমস্যার সমাধানও করা হয়।
পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শেষ। এখন শুধু উদ্বোধনের অপেক্ষা। আগামী ২৫ জুন চালু হচ্ছে স্বপ্নের এই সেতু। বহু মানুষের মেধা, শ্রম কাজ করেছে এর পেছনে। এরই একজন ড. হোসাইন মো. শাহিন। ২০১৮ সাল থেকে পদ্মা সেতু প্রকল্পে তিনি বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন।
প্রকৌশলী অধ্যাপক ড. হোসাইন মো. শাহিন ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ থানার বলাখাল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে বিএসসি পাস করে উচ্চ শিক্ষার জন্য চলে যান জাপানে। সেখান থেকে একই বিষয়ে এমএসসি এবং পিএইচডি শেষ করে ওই প্রতিষ্ঠানেই সহযোগী অধ্যাপক হিসাবে যোগ দেন। সেখানে দশ বছর শিক্ষকতা করে ২০১৫ সালের মার্চে গাজীপুরের বোর্ডবাজার এলাকার ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজিতে (আইইউটি) সিভিল অ্যান্ড ইনভাইরনমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং (সিইই) বিভাগে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি ওই বিভাগের প্রধান হিসাবে আছেন।
তিনি বলেন, ‘পদ্মা নদী খরস্রোতা হিসাবে পরিচিত। সেই নদীর উপর সেতু করা একটা সময় স্বপ্নের মতো ছিলো। ছিলো অকল্পনীয়। সেটি এখন আর স্বপ্ন নয়, বাস্তবে রূপ নিয়েছে। এই সেতু নির্মাণে বিশ্বের সবচেয়ে সর্বাধুনিক সব প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। এই সেতু নির্মাণের মধ্যদিয়ে প্রমাণ হয়েছে আমাদের দেশে বড় বড় সেতু তৈরি করা অসম্ভব নয়।
তিনি বলেন, ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে পদ্মা সেতুর ৬ নম্বর পিলারের পাইলিংয়ের কাজ শুরু হয়। এরপর ৭ ও ৬ নম্বর পিলারে তিনটি করে মোট ছয়টি পাইলের বটম সেকশনের কাজ করা হয়। কিন্তু এসব পাইল বসাতে গিয়ে নদীর তলদেশে নরম মাটির স্তর পাওয়া যায়। তখন দুটি পিলারের ছয়টি পাইলের টপ সেকশনের কাজ বন্ধ রাখা হয়। মাওয়া প্রান্তে কাজ বন্ধ রেখে জাজিরা প্রান্তে পদ্মা সেতুর কাজ শুরু হয়। পরে আরো ২১টি পিলারের পাইল বসানোর সময় মাটির স্তরে কাদামাটি পাওয়া যায়। তখনই প্রকল্পের সবাই পদ্মা সেতুর পাইলের সমস্যা সমাধান করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। দীর্ঘদিন এক পাশের কাজ বন্ধ ছিলো। ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে তাকে যুক্ত করা হয় পদ্মা সেতুর পাইল সমস্যা সমাধানে নিয়োজিত বিশেষজ্ঞ দলে।
একটি বিশেষজ্ঞ টিম দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় সেই পাইলের সমস্যা সমাধান করা হয়। তাদের করা নতুন ডিজাইন বহির্বিশ্বের বিশেষজ্ঞদের কাছে পাঠিয়ে নতুন ডিজাইন অনুমোদন করা হয়। এরপর আবার পাইলের কাজ শুরু করা হয়। সমস্যা সমাধানে কাজ শুরু করে বৃটিশ পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। মাটি পরীক্ষার প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন তথ্য যাচাই করেন। তাদের পরামর্শ অনুযায়ী, কাদামাটির পর শক্ত মাটি না পাওয়ায় পদ্মা সেতুর ২১টি পিলারের মধ্যে পাইলের সংখ্যা একটি করে বাড়ানো হয়। অন্যদিকে এসব পিলারে খাঁচ কাটা পাইল বসিয়ে বিশেষ ধরনের সিমেন্টের মিশ্রণে নরম মাটি শক্ত করা হয়। কিন্তু ৬ ও ৭ নম্বর পিলারে আগে থেকে ছয়টি পাইল বসে যাওয়ায় চিন্তায় পড়েন বিশেষজ্ঞরা। এসব পাইল তুলে নতুন করে পাইল বসানোর কথাও ভাবা হয়। শেষ পর্যন্ত আগে থেকে বসে যাওয়া পাইলগুলো রেখেই ৬ ও ৭ নম্বর পিলারের নকশা চূড়ান্ত করা হয়। সেগুলোর মাঝে একটি করে নতুন পাইল যুক্ত করে সেই সমস্যার সমাধান করা হয়।
ড. হোসাইন মো. শাহিন বলেন, পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজে গুণগত মানের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের কম্প্রোমাইজ করা হয়নি। সেতুতে একসঙ্গে ট্রেন চলবে, ট্রলারের ধাক্কা লাগতে পারে এবং ভূমিকম্প হলেও সেতুর কোনো ধরনের ক্ষতি হবে না। এসব সমস্যা আগে থেকেই শতভাগ নির্ণয় করেই পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ করা হয়েছে। সারা দেশবাসীর মতো আমিও পদ্মা সেতু উদ্বোধনের অপেক্ষায় আছি। এতো বড় কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে পেরে গর্ববোধ করছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *