ফরিদগঞ্জে ভোট দিলেন না ১২ হাজার নারী ভোটার

ফরিদগঞ্জের রূপসায় এবারের নির্বাচনেও ঘটেনি ব্যতিক্রম। দু-একজন সচেতন নারী ছাড়া কেউই আসেননি ভোটকেন্দ্রে। কেন্দ্রগুলোতে একজন, দুইজন করে নারী ভোটার ভোট দিয়েছেন। তাঁরাও দিয়েছেন চুপিসারে। তবে পুরুষ ভোটারের লাইন ছিল দীর্ঘ। ভোটগ্রহণে নিয়োজিত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা এমন দৃশ্য দেখে হতবাক।

চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জের উপজেলার রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নের চিত্র এটি। ১২ হাজারের বেশি নারী ভোটার থাকলেও সেখানে মাত্র কয়েকজন নারী চুপিসারে ভোট দিয়েছেন। পঞ্চম ধাপে চাঁদপুরের ২৯টি ইউনিয়ন পরিষদে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। এ সময় সংঘর্ষে দুজন নিহত হয়েছেন।

চরমান্দারি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে ভোট দিতে আসা আব্দুল আউয়াল (৫০) নামে একজন বলেন, নারীদের ভোট দিতে জৈনপুরের হুজুরের নিষেধ আছে। তাই নারীরা ভোট দিতে আসছেন না।

কাউনিয়া শহীদ হাবিবউল্লাহ হাই স্কুল ভোটকেন্দ্রে ভোট দেন সাবেক সংসদ সদস্য ড. শামছুল হক ভূঁইয়ার সহধর্মিণী ডা. আনোয়ারা হক। তাঁর মতো আরো কয়েকজন সচেতন নারী ভোট দিলেও প্রার্থীদের নারী এজেন্ট, এমনকি নারী প্রার্থীদেরও কেন্দ্রে দেখা মেলেনি।

গৃদকালিন্দিয়া হাই স্কুল ভোটকেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার আয়াস উদ্দিন জানান, তাঁর কেন্দ্রে একজন নারী ভোট দিয়েছেন। অথচ এই কেন্দ্রে নারী ভোটারের সংখ্যা ১১ হাজার ৫০০।

চরমান্দারি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার খোরশেদ আলম জানান, এই কেন্দ্রে ৮০০ ভোটারের মধ্যে মাত্র দুজন নারী ভোট দিয়েছেন। তবে শেষ পর্যন্ত ৯টি কেন্দ্রে সব মিলিয়ে ১৫-২০ নারী ভোট দেন।

চাঁদপুরের পুলিশ সুপার মিলন মাহমুদ বলেন, জেলার তিনটি উপজেলার ২৮টি ভোটকেন্দ্রের সব কিছু স্বাভাবিক দেখলেও রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নে নারীদের ভোট দিতে না দেখে হতবাক হন। তিনি বলেন, ‘কয়েক দিন আগে জেলা প্রশাসকসহ এখানে এসে নারীদের ভোটদানে উদ্বুদ্ধকরণ সভা করেছি। কিন্তু তাতেও ফল মেলেনি।’

স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ষাটের দশকে ইউনিয়নের গৃদকালিন্দিয়া বাজারের পূর্ব পাশে বসবাস করতেন জৈনপুরের পীর মওদুদুল হাসান। ওই সময় এলাকায় কলেরা-বসন্ত মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে মহামারি থেকে রক্ষা পেতে দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। এ সময় পীর মওদুদুল হাসান জানান, নারীদের বেপর্দার কারণেই এই মহামারি। তাই নারীদের কখনোই পর্দার খেলাপ করা যাবে না। এর কিছুদিন পর ভারতের জৈনপুরে চলে যান পীর মওদুদুল হাসান। স্বাধীনতার পর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে সুবিধাবাদীরা তাঁর কথার ওপর রং চড়িয়ে প্রচার করে, নারীরা ভোট দিলে এলাকায় আবারও কলেরা-বসন্ত ছড়িয়ে পড়বে। ব্যস, সেই থেকে আজ পর্যন্ত নারীদের ভোট দেওয়া বন্ধ! ইউনিয়নের পূর্ব ও পশ্চিম কাউনিয়া, চরপক্ষিয়া, চরমান্দারি, উত্তর ও দক্ষিণ সাহেবগঞ্জ, সাহেবগঞ্জ, গৃদকালিন্দিয়া, চরমুঘুয়া গ্রামের নারীরা যুগের পর যুগ ধরে নিজ ইচ্ছায়ই ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকছেন।

ফরিদগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, রূপসা দক্ষিণ ইউনিয়নে মোট ভোটার হচ্ছেন ২৪ হাজার ৪৫৪ জন। তার মধ্যে নারী ভোটার রয়েছেন ১২ হাজার ১১৪ জন। আর চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন ১০ জন নারীসহ শতাধিক প্রার্থী।

সময় ডেস্ক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *