বাড়তি ভাড়ায় অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে ঢাকা ছাড়ছে লঞ্চ

স্টাফ রিপোর্টার দরজায় কড়া নাড়ছে মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর। একদিকে দীর্ঘ ছুটির আমেজ অন্যদিকে তীব্র গরম ও যানজট উপেক্ষা করে প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদ করতে রাজধানী ছাড়ছে নগরবাসী।
শনিবার (৩০ এপ্রিল) ঘরমুখো মানুষের উপচে পড়া ভিড় দেখা যায় ঢাকার সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে। বিকেল থেকেই যেন পুরো সদরঘাট জনসমুদ্রে পরিণত হয়। তবে বাড়তি ভাড়া নিয়ে ভোগান্তির শেষ নেই। অনেক যাত্রীর অভিযোগ, আগের চেয়ে বেশি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া প্রায় প্রতিটি লঞ্চে নেওয়া হচ্ছে ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী। এদিন লঞ্চের ভেতরে জায়গা না পেয়ে ছাদে চড়েও যাত্রীদের ঢাকা ছাড়তে দেখা গেছে।
সরেজমিনে সদরঘাট লঞ্চঘাটে গিয়ে দেখা যায়- এদিন সকাল থেকেই টার্মিনালে যাত্রীদের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। অনেক যাত্রী লঞ্চ ছাড়ার কয়েক ঘণ্টা আগে থেকে এসে বসে ছিলেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিড়ও বাড়তে থাকে। বিকেল ৩টার মধ্যেই বেশির ভাগ লঞ্চের কেবিন বুক হয়ে যায়। সন্ধ্যার দিকে চাপ ছিল উপচে পড়া। তবে নতুন পল্টুন স্থাপন করায় আয়তন ও প্রস্থ বেড়েছে টার্মিনালের। ফলে ভিড় থাকলেও নির্বিঘ্নে যাত্রীরা লঞ্চে উঠতে পারছেন।

এদিকে ঘরমুখো মানুষের ভিড়ের কারণে রায়সাহেব বাজার থেকে সদরঘাট পর্যন্ত ছিল বাড়তি যানবাহনের চাপ। বাহাদুর শাহ পার্কের আশপাশের এলাকাগুলোতে যাত্রীদের কিছুটা হলেও ভোগান্তির শিকার হতে হয়েছে। কারণ বাহাদুরশাহ পার্ক থেকে সদরঘাট পর্যন্ত দুইপাশে যানবাহনের চাপ ছিল বেশি।
গাজীপুর থেকে সদরঘাট আসা বরিশালের মেহেন্তিগঞ্জের যাত্রী মো. জুয়েল বাংলানিউজকে বলেন, তীব্র যানজটের কারণে সদরঘাট পর্যন্ত পৌঁছাতে লেগেছে ৪ ঘণ্টা। অনেক কষ্ট হয়েছে। তবুও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারবো এই আশায় বাড়ি যাচ্ছি।
বরগুনাগামী লঞ্চের যাত্রী মো. ইসমাইল ও রোকন আহমেদ বাংলানিউজকে বলেন, আমরা গাজীপুর থেকে সকালে রওয়ানা হয়েছি। মাত্র ঘাটে এসে নামলাম। পথে কোনো সমস্যা না হলেও টার্মিনালের গেটে প্রচুর যাত্রীর চাপ। গরমের জন্য কষ্ট হচ্ছে। এছাড়া লঞ্চের ভাড়া অন্য যেকোনো সময় থেকে একটু বেশি নিচ্ছে। কেবিন পাইনি। তাই ডেকে বিছানা করে যাচ্ছি।
নরসিংদী থেকে স্বামী-সন্তান নিয়ে এসেছেন নারগিস বেগম, যাবেন ভোলা। তিনি শুধু এক লঞ্চ থেকে অন্য লঞ্চে ছুটছেন। কারণ জিজ্ঞেস করতেই বলেন, আমরা স্বল্প আয়ের মানুষ। যে লঞ্চে ভাড়া কম পাব, সে লঞ্চেই যাব। এ পর্যন্ত তিনটা লঞ্চে উঠেছি। সবাই আগের থেকে অনেক বেশি ভাড়া চাইছে। তাই নেমে গেছি। আগে ৩০০ টাকা দিয়ে যেতাম। এখন ৪৫০ টাকা চাচ্ছে। বেশি ভাড়া দিয়ে গেলে ঈদে খরচের টাকায় টান পড়বে।
এস ভি টিপু-৪ এর কেরানি সোহাগ বাংলানিউজকে বলেন, যাত্রীরা সকাল থেকেই আসতে শুরু করেছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডাব্লিউটিএ) অনুমতি পাওয়া গেলে লঞ্চ ভরলেই ছেড়ে দেওয়া হবে। আমাদের লঞ্চের আসন সংখ্যা ৫০১ জনের। কিন্তু ঈদ মৌসুম তাই একটু বেশি যাত্রী যাচ্ছে। আমরা সরকার নির্ধারিত ভাড়াই নিচ্ছি।
ঢাকা-হুলারহাট-ভাণ্ডারিয়া রুটের পারাবত-৮ নামের লঞ্চের সামনে গিয়ে দেখা যায়, মানুষ টিকেট কেনার সময় জাতীয় পরিচয় নম্বর চাওয়ার সরকারি নির্দেশনা থাকলেও অনেকের কাছে তা চাওয়া হচ্ছে না। লঞ্চের সুপারভাইজার আব্দুল জলিল মোল্লা বলেন, সবার কাছে জাতীয় পরিচয়পত্র চাওয়া হচ্ছে। বেশির ভাগ মানুষই আনছে না। ফলে মোবাইল নম্বর নিয়ে টিকেট দেওয়া হচ্ছে।
বিআইডব্লিউটিএ’র যুগ্ম পরিচালক শেখ মোহাম্মদ সেলিম রেজা বাংলানিউজকে বলেন, ঈদ উপলক্ষে যাত্রীরা ইতোমধ্যেই বাড়ি যেতে শুরু করেছেন। লঞ্চ টার্মিনালে যাত্রীদের প্রচুর ভিড়। ঈদে ঘরমুখো মানুষের নিরাপত্তা দিতে পুলিশ, র‌্যাব, আনসার, নৌ-পুলিশ ও বিএনসিসিসহ বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। এবার ঈদের আগে বেশ কয়েকদিন ছুটি থাকায় যাত্রীরা ধীরে ধীরে ঢাকা ছাড়ছে। আশা করছি, তারা নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে গন্তব্যে পৌঁছতে পারবেন।
তিনি আরও বলেন, আমরা নিরাপত্তা নিশ্চিত করে লঞ্চ ছাড়ছি। লঞ্চে লাইফ বয়া, ফায়ার বাকেট, দক্ষ চালক এবং অতিরিক্ত যাত্রী নিচ্ছে কিনা সে বিষয়ে নজর রাখা হচ্ছে। লঞ্চের লোড লাইনের অতিরিক্ত যাত্রী নিতে দেওয়া হচ্ছে। ভাড়া বেশি নেওয়া হচ্ছে না। আমাদের নজরে এমন কিছু আসেনি। বরং ঈদে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সরকার নির্ধারিত ভাড়াই নিচ্ছে বলে জানান তিনি।
সদরঘাট নৌ থানা কন্ট্রোল রুমের দায়িত্বে থাকা পুলিশ পরিদর্শক তরিকুল ইসলাম বলেন, যাত্রী সেবায় আমরা সর্বদা সজাগ রয়েছি। এখনও পর্যন্ত কোনও অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।
লঞ্চ টার্মিনালে ট্রাফিক ও নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণের অফিস থেকে জানা গেছে, শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত দেশে ৪৫টি নৌ-রুটে ঢাকা থেকে লঞ্চ ছেড়ে গেছে ৯০টি, ঢাকায় এসেছে ১০৯টি। রাত পর্যন্ত সব মিলিয়ে ১৪০টির মতো লঞ্চ ঢাকা ছেড়ে যাবে। শুক্রবার ঢাকা ছেড়ে গেছে ১৩০টি লঞ্চ। ঈদের আগে প্রতিদিন ৮০ থেকে ৮৬টি লঞ্চ বিভিন্ন রুটে চলাচল করতো।

Leave a Reply

Your email address will not be published.