ভাঙ্গা সড়কে চরম দুর্ভোগ

ফরিদুল ইসলাম বৃষ্টি বাদলের দিন না আসতেই সড়কে চলছে সীমাহীন যাত্রী দুর্ভোগ। চাঁদপুরের অধিকাংশ ভাঙ্গাচুরা সড়কে যাত্রীদের এখন ত্রাহি অবস্থা। চাঁদপুর পৌর এলাকাসহ সদর উপজেলার প্রধান প্রধান সড়কই যেন মৃত্যু ফাঁদে পরিনত হয়েছে। ঘটছে দুর্ঘটনা, মরছে মানুষ। দীর্ঘ হচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল। গত এক বছরে চাঁদপুরের বিভিন্ন স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে শতাধিক বনিআদম। সড়কে মৃত্যুর মিছিল প্রতিনিয়ত দীর্ঘ হলেও সড়ক সংস্কারের তেমন কোন উদ্যোগ চোখে পড়ছে না কোথাও।

তবে সড়কের যে কাজ করা হয় তা নিয়েও যথেষ্ট অভিযোগ রয়েছে সাধারণ মানুষের। এসব কাজের ব্যাপারে বিস্তর অভিযোগ থাকলেও কেউ সেদিকে কর্ণপাত করছে না কোন কালেই। ফলে বছরান্তে রাস্তা আবার সেই পূর্বের স্থানে ফিরে যায়। তাই ভাঙ্গাচুরা রাস্তাই যেন নিত্য সঙ্গি চাঁদপুরবাসীর। আর সড়কে অহরহ প্রাণ হারানোই যেন নিয়তি।

সম্প্রতি হরিনা ফেরিঘাট থেকে ফরিদগঞ্জগামী সড়কটি মেরামত করা হলেও দক্ষিনাঞ্চলের অধিকাংশ সড়কই এখনো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। চাঁদপুর শহরের মরহুম আব্দুল করিম পাটওয়ারী সড়কের অবস্থা দিন দিন আরো খারাপ হচ্ছে। এই সড়কের অধিকাংশ যায়গাতে রয়েছে ছোট বড়ো অসংখ্য গর্ত। এসব গর্তে পড়ে শহরে চলাচলকারী অনেক যানবাহনই বিকল হচ্ছে প্রতিদিন এবং অহরহত ঘটছে দুর্ঘটনা।

তাছাড়া শহরের ট্রাক রোড যেন এখন মরণ ফাঁদে পরিনত হয়েছে। মিশন রোডের মাথা থেকে আইডব্লিউটি এর মোড় পর্যন্ত সড়কেটির চিত্র দিন দিন আরো খারাপের দিকে ধাবিত হচ্ছে। বিগত কয়েক বছর আগে সড়টি বিপুল পরিমান অর্থ ব্যায় করে সংস্কার করা হলেও বছর না যেতেই অনিয়মের চিত্র ফুটে উঠে স্থানে স্থানে। সর্বশেষ সংস্কারের সময় পুরো সড়কের মাটি উঠিয়ে প্রায় ৭ ফুট গর্ত করে রাখা হয়েছিল প্রায় তিন থেকে চার মাস। সবাই ভেবেছিল এবার হয়তো সড়কটি আন্তার্জাতিক মানের হবে ? কিন্তু বিধি বাম। আন্তর্জাতিক তো দূরে থাকুক কোন মানের মধ্যেই পড়েনি সড়কটির কাজ। বছরের মাথায় অসংখ্য গর্তে ভরে ওঠে পুরো সড়ক।

এই সড়ক দিয়ে শত শত ভারি যানবাহন চলাচল করলেও সড়কটি সংস্কারে এখনো কোন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না। ফলে স্থানীয় এলাকাবসী থেকে শুরু করে যানবাহন চালক, যাত্রী ও পথচারীদের দুর্ভোগ দিন দিন বেড়েই চলছে।

শহরের বঙ্গবন্ধু সড়কের মতো ব্যস্তা সড়কটিও যথষ্টে দুর্ঘটনা প্রবণ। ভাঙ্গাচুরা আর গর্তে ভরা এই সড়কে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। কতদিন পূর্বে এই সড়কটি সংস্কার হয়েছে তা অনেকেরই অজানা।

এরপর ভয়ংকর ভাঙ্গা সড়কের তালিকায় রয়েছে পুরান বাজার জাফরাবাদ হয়ে দোকানঘর সড়ক। বর্তমানে এই সড়কটি এতোটাই বিপর্যস্ত যে, এই রাস্তা দিয়ে স্বাভাবিক হাটাচলাও এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে মরহুম আলম মোল্লার বাড়ীর সামনে একটি চক্র রাস্তার উপর দিয়ে নিয়েছে বালু উত্তোলনের পাইপ। ইটের সুড়কি দিয়ে রাস্তাটিকে প্রায় দেড় ফুট উচু করে তোলায় ছোট ছোট যানবাহনগুলো পড়েছে আরো বেকায়দায়। রাস্তার প্রতি ইঞ্চিতে রয়েছে গর্ত। এসব গর্তে পড়ে প্রতিদিনই ঘটছে দুর্ঘটনা। এই সড়কটিতে যে যার মতো করে কেটে দিচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়। এই সড়কটি গত দুবছর আগে পুরান বাজারের জনৈক ঠিকাদার কাজ সম্পন্ন করার ৬ মাসের মাথায় পলেস্তরা উঠতে শুরু করে। বর্ষা মওসুমের প্রথম বৃষ্টিতেই কাজের অনিয়মের চিত্র ফুটে উঠে। বলতে গেলে এক ধোয়াতেই রাস্তা শেষ হয়ে যা। এরপর এক বছরের মাথায় পুরো রাস্তাটিই খানখন্দকে ভরে ওঠে। এর পর থেকে রাস্তার চিত্র আরো ভয়াবহ হয়ে উঠলেও সংস্কারের কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। বর্তমানে সড়কটি পড়ে রয়েছে সম্পূর্ণ অবহেলায়।

গতকাল ০৮ মার্চ সকালে দোকানঘর রামদাসদী এলাকার আলম মোল্লা বাড়ীর বাসিন্দা নাম প্রকাশে অনুচ্ছিুক একব্যাক্তি জানান, ‘এই ভাঙ্গা রাস্তা দিয়ে যানবাহন চলাচলেই দায়। এর মধ্যে আবার সড়কটির উপর দিয়ে বালু উত্তোলনের পাইপ নেয়া হয়েছে। এতে যানবাহন চলতে পারছে না। পাইপটি বসানোর সময় পুলিশ এসে বাধা দিয়েছিল কিন্তু সেই পর্যন্তই শেষ। পাইপ পাইপের যায়গাতে রয়েগেলো আর পুলিশ চলেগেছেন পুলিশের যায়গাতে।’

এই সড়কে চলাচলকারী সিএনজি ড্রাইভার মানু দর্জি চাঁদপুর সময়কে বলেন, ‘ভাই আর কইয়েন না, সিএনজির মাল লাগাইতে লাগাইতে জীবন শেষ।’ গাড়ী চালিয়ে এখন আর ফয়দা নাই। যা ইনকাম অয় তার মেক্সিমাম কাম করাইতেই চইল্লা যায়। এই পেশায় টিকে থাকা এখন খুবই কঠিন। চোরারা চুরি করে রাস্তা বানায়। একবছরও টিকে না এই রাস্তা। অথচ ভালোভাবে কাজ করলে ৫/১০ বছরেও কিচ্ছু অইবো না।’

চাঁদপুরের শহরের আরেকটি ঝুঁকিপূর্ণ সড়কের নাম হলো দোকানঘর থেকে হরিনা চৌরাস্তা সড়ক। এই সড়কেটির পলেস্তরা ঠিক থাকলে রাস্তার চিত্র ভয়াবহ অবস্থায় রয়েছে। চোখের দৃষ্টিতে সড়কটি ফিটফাট থাকলেও ভারি যানবাহনের চাকার নিচে পড়ে ঢেউ খেলানো রাস্তায় পরিনত হয়েছে। বাস্তবে রাস্তায় চললেও মনে হবে নদীতে হেলেদুলে চলছি। কারণ কদমে কদমে রাস্তা ডেবে যাওয়ার কারণে রাস্তাটি দিয়ে কোন যানবাহনই এখন আর স্বাভাবিক ভাবে চলাচল করতে পারছে না। বলতে গেলে অনেক ঝুঁকি নিয়েই এই রাস্তা দিয়ে জেলার দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ যাতায়ত করে থাকেন।

তবে প্রতিদিন শত শত ভারি যানবাহন চলাচল করে এই রাস্তা দিয়ে। কিন্তু এসব ভারি যানবাহনের উপযোগী রাস্তা কখনোই তৈরী হয়নি এখানে। তাই যেহেতু এই রাস্তাটি দিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ভারি যানবাহন চলাচল করে তাই রাস্তাটি সেই মানের হওয়া জরুরি বলে মনেকরছেন স্থানীয় এলাকাবাসী।

এ ব্যাপারে বরগুনা থেকে যন্ত্রাংশ নিয়ে আসা ট্রাকের ড্রাইভার রশিদ সিকদার চাঁদপুর সময়কে বলেন, ভাই আমরা এই রাস্তা দিয়ে আসতে হয়। কিন্তু রাস্তাটির যে অবস্থা টান দেওয়া যায় না। কোন রকম টেনেটুনে পারহচ্ছি। টান দিতে গেলেই উল্টে পড়বে। ’

চাঁদপুর-আলগী যাতায়াতকারী বহরিয়ার শ্রীরামপুর এলাকার বাসিন্দা সিএনজি ড্রাইভার মহসিন জমাদার চাঁদপুর সময়কে জানান, কয়েক দিন পর পর গাড়ীর বেয়ারিং আর সকেট বাম্পার পাল্টানো লাগে। কি আর কুম, রাস্তার অবস্থা খারাপ হওয়ার কারণে গাড়ীর অবস্থা শেষ।’ যা ইনকাম অয় সব গাড়ীর মধ্যেই চইল্লা যায়।’ কি খামু আর কেমনে বাচমু বুঝতে পারছি না।’
এছাড়া চাঁদপুরের ওয়ারলেছ থেকে ফরিদগঞ্জ সড়কের স্থানে স্থানে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এই রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার বড়ো ছোট যানবাহন চলাচল করে। এই সড়কে অহরত ঘটছে দুর্ঘটনা। কিন্তু সড়কটি সংস্কারের কোন উদ্যোগ না থাকায় ঝুঁকি দিন দিন বেড়েই চলছে। রাস্তার দুই পাশে নিচের দিকে ডেবে যাওয়ার কারণে অনেক যানবাহন বুঝতে না পেরে সাইড নিতে গেলেই পড়তে হচ্ছে বিপদে। অসংখ্য আইল্যান্ডে ভরা এই সড়কে যানবাহান চলছে ঝুঁকি নিয়েই। এব্যাপারে বাগাদী এলাকার সিএিনজি ড্রাইভার সুমন চাঁদপুর সময়কে জানান, রাস্তার গর্তের মধ্যে পড়ে সিএনজির এক্সেল ভেঙ্গে পড়েছে কয়েকবার। এছাড়া সকেট বাম্পার থেকে শুরু করে সব কিছু কয়দিন পর পর পাল্টাতে হয়। রাস্তা ঠিক না থাকার কারণে দুঘর্টনা ঘটছে অহরহ।’

এদিকে হাজীগঞ্জ-নোয়াখালী-লক্ষীপুর সড়কের চিত্র দিন দিন আরো ভয়য়কর হয়ে উঠছে বলে অভিযোগ চালকদের। এই সড়কটি দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার বড়ো ছোট যানবাহন চলাচল করছে। বিআরটিসির বাস থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাস ট্রাক যাতায়াত করছে এই সড়ক দিয়ে। কিন্তু সড়কটি যে মানের হওয়ার কথা তা না হওয়ার কারণে রাস্তা ডেবে ডেবে ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। হাজীগঞ্জে অপেক্ষমান বিআরটিসির বাস ড্রাইভার লিয়াকত জানান, আমরা দীর্ঘ সময় গাড়ীতে থাকি। রাস্তার অবস্থা ঠিক না থাকলে আমরা অনেক ঝুঁকির মধ্যে পড়ি। অনেক সময় রাস্তার অবস্থা দূর থেকে বুঝা যায় না। এতে গর্তের মধ্যে পড়ে গাড়ী লাফিয়ে উঠে। যে কোন সময় ঘটতে পারে দুর্ঘটনা।’

বস্তুতঃ চাঁদপুরের প্রধান প্রধান সড়কগুলোর চিত্র এখন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাড়ছে নিরাপত্তাহীনতা। এসব সড়কের দ্রুত সংস্কারের উদ্যোগের পাশাপাশি কাজের মানের দিকে নজর দেয়া উচিৎ বলে মনেকরছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ব্যাপারে সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ভালো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দ্রুত কাজ করার জন্য আহবান জানিয়েছেন ভুক্তভোগী মহল।

Leave a Reply

Your email address will not be published.