রমজানে স্বল্পমূল্যে পণ্য পাবে কোটি পরিবার

স্টাফ রিপোর্টার বৈশ্বিক মহামারী করোনায় বেড়েছে খরচ, কমেছে আয়। ফলে মানুষের নিদারুণ কষ্টও বেড়েছে। কম খরচে পণ্য কিনতে তাই সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ট্রাক আসার আগেই চলে লাইন দখলের লড়াই। অনেক সময় রোদে পুড়ে এবং বৃষ্টিতে ভিজেও শূন্যহাতে ফিরে যেতে হয় অভাবীদের।
এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের কষ্ট লাঘবে স্বল্পমূল্যে ভোগ্যপণ্য আরও বেশি সরবরাহের দিকে নজর দিয়েছে সরকার। ভর্তুকি মূল্যে কোটি পরিবারকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সেই আলোকে ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও টিসিবি।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (আইআইটি) এএইচএম শফিকুজ্জামান বলেন, ‘এবার রমজানে টিসিবির কার্যক্রম দুই থেকে তিনগুণ বাড়ানো হবে। এই সেবার আওতায় আনা হবে এক কোটি পরিবারকে। এর আগে মহামারী করোনার সময় ৩৮ লাখ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে নগদ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তারাও এ তালিকায় থাকবে। এর বাইরে বাকি ৬৮ লাখ পরিবারকে কীভাবে এ প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত করা যায় তা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও টিসিবি প্রস্তুতি নিচ্ছে।
করোনা পরিস্থিতিতে নিম্নআয় ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কথা বিবেচনা করে সারাদেশে ডিলার ট্রাকের মাধ্যমে সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য বিক্রি করছে টিসিবি। পাশাপাশি প্রতিবছর রমজানেও বাড়তি বরাদ্দ রেখে ট্রাক সেলে পণ্য বিক্রি করে সংস্থাটি। তবে এ পদ্ধতিতে পণ্যসামগ্রী যাদের পাওয়ার কথা তারা পাচ্ছেন না। গরিবের পণ্য চলে যাচ্ছে প্রতারকদের পকেটে। ফলে অনেক দরিদ্র বঞ্চিত হচ্ছেন। তাই সরকার দরিদ্রদের তালিকা করে টিসিবির মাধ্যমে খাদ্যপণ্য সরবরাহের কথা ভাবছে। এ পরিকল্পনায় আগামী রমজান মাসে এক কোটি পরিবারকে সরকার ভর্তুকি মূল্যে পণ্য সরবরাহ করবে বলে জানা গেছে।
এর আগে গত ৩ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সিনিয়র সচিব মো. তোফাজ্জল হোসেন মিয়ার সভাপতিত্বে এক সভায় কোভিডের সময় নগদ প্রণোদনা পাওয়া দরিদ্র কর্মহীন পরিবারকে টিসিবির ভর্তুকি মূল্যের পণ্য পৌঁছে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। পরে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রমজানে এক কোটি পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন বলে বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে।
সে অনুযায়ী, সারাদেশে জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের মাধ্যমে তালিকাভুক্ত এক কোটি পরিবারের জন্য সয়াবিন তেল, চিনি, ডাল, ছোলা, পেঁয়াজ ও খেজুর সরবরাহ করবে টিসিবি। ঈদের আগে একটি পরিবার দুবার এসব পণ্য পাবেন। এ প্রক্রিয়ায় প্রথম দফায় শবেবরাত থেকে রমজান শুরুর আগে পণ্য সরবরাহ করা হবে। দ্বিতীয় দফায় সরবরাহ করা হবে মধ্য রমজান থেকে ঈদের আগে। এ পদ্ধতিতে সরবরাহকৃত পণ্য আগে থেকেই নির্ধারিত পরিমাপ অনুযায়ী প্যাকেটজাত করা থাকবে। প্রতি দফায় এসব পণ্য পেতে খরচ হবে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা। জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের মাধ্যমে উপকারভোগীদের তালিকা করে ফ্যামিলি কার্ড সরবরাহ করা হবে। নির্ধারিত সময়ে প্রতিটি পরিবারের মোবাইল ফোন নম্বরে চলে যাবে এসএমএস। তাতেই উল্লেখ থাকবে কবে, কোত্থেকে বরাদ্দকৃত পণ্য সংগ্রহ করতে হবে।
জানা গেছে, সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত পরিবারের সংখ্যা প্রায় ৫০ লাখ, যাদের বড় অংশই নগদ সহায়তাভুক্ত সাড়ে ৩৮ লাখের মধ্যে রয়েছে। এগুলো যাচাই-বাছাই করে জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে দরিদ্রদের তালিকা তৈরি করা হবে। তালিকাভুক্তদের মধ্যে যাদের ফ্যামিলির কার্ড নেই, তাদের কার্ড দেওয়া হবে। এসএমএস পাওয়ার পর নির্ধারিত দিনে, নির্ধারিত স্থানে গিয়ে খাদ্যপণ্য সংগ্রহ করবেন তারা।
টিসিবির মুখপাত্র হুমায়ুন কবির বলেন, এখনো পর্যন্ত আমাদের কাছে যে তথ্য রয়েছে, তা হচ্ছে- রমজানে ঢাকা ও বরিশালে টিসিবি যেভাবে ট্রাক সেলের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি করছে, সেভাবেই চলবে। কারণ তালিকায় ঢাকা ও বরিশাল সিটি করপোরেশনভুক্ত দরিদ্র জনগোষ্ঠী এখনো অন্তর্ভুক্ত হয়নি। তাই এ দুই বিভাগে আগের মতোই টিসিবির কার্যক্রম চলবে। তবে অন্যান্য বিভাগে তালিকা অনুযায়ী জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের কাছে পণ্য সরবরাহ করবে টিসিবি। সেখান থেকে এসএমএসের মাধ্যমে পণ্য সরবরাহ করা হবে।
এ বিষয়ে শফিকুজ্জামান জানান, ঢাকা ও বরিশাল সিটি করপোরেশনভুক্ত দরিদ্র জনগোষ্ঠী তালিকা প্রণয়ন করা হবে। এতে প্রায় ১২ লাখ পরিবার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে রমজানে তালিকা ধরে এক কোটি পরিবারকে ভর্তুকি মূল্যে পণ্য সরবরাহের সরকারের এ ভাবনাকে ইতিবাচক বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জও রয়েছে বলে মনে করছেন তারা।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, কোভিডের কারণে দেশে দরিদ্র্য লোকের সংখ্যা বেড়েছে। এ জন্য সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে। যদিও দেশে মানুষের চাহিদা মেটানো কঠিন। দরিদ্র লোকের সংখ্যা বেশি। একদিকে রাজস্ব আহরণ বাড়ছে না। অন্যদিকে প্রশাসনিক ও ঋণের পেছনে খরচ বাড়ছে। তবে মানুষের কষ্ট কমাতে উদ্যোগ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে সঠিক লোক যাতে সুবিধা পায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে সার্ভের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ডাটা তৈরির করার পরামর্শও দেন তিনি।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) চেয়ারম্যান ও সাবেক বাণিজ্য সচিব গোলাম রহমান বলেন, সরকারের এমন উদ্যোগ খুবই ভালো। এক কোটি পরিবার মানে (প্রতি পরিবারে ৫ জন করে সদস্য ধরে) ৫ কোটি মানুষের খাদ্য নিশ্চিত করা যাবে। যদিও উপকারভোগী সঠিকভাবে নির্ধারণ করা কঠিন চ্যালেঞ্জ। এ ক্ষেত্রে প্রকৃত অভাবীরাই যাতে এ সুবিধা পায় তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি মানুষের জীবন সহজ করতে বাজার নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ নিতে হবে। প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে পদক্ষেপ নিতে হবে।
গত ৩ ফেব্রুয়ারি থেকে রাজধানীসহ সারাদেশে ৪৫০টি ট্রাকে করে পেঁয়াজ, মসুর ডাল, চিনি ও সয়াবিন তেল বিক্রি করছে টিসিবি। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে অষ্টমবারের মতো সব মহানগর, জেলা ও উপজেলার ডিলার পয়েন্টে এ কার্যক্রম পরিচালনা করছে সংস্থাটি। আগামী ২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত এ কার্যক্রম চলবে। এ দফায় মসুর ডালের দাম কেজিপ্রতি ৫ টাকা বাড়িয়ে ৬৫ টাকায় বিক্রি করছে টিসিবি। এ ছাড়া ডিলার ট্রাকে প্রতিকেজি চিনি ৫৫ টাকা, পেঁয়াজ ৩০ টাকা এবং সয়াবিন তেল প্রতিলিটার ১১০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, কোভিডকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঈদ উপহার দেওয়ার জন্য ৫০ লাখের তালিকা করা হয়েছিল। তালিকায় পেনশনার, সরকারি চাকরিজীবী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নাম থাকায় তা নিয়ে বিতর্ক দেখা দিলে যাচাই-বাছাই শেষে ৩৫ লাখ পরিবারকে নগদ সহায়তা দেওয়া হয়। পরে সড়ক পরিবহন, নৌপরিবহন শ্রমিক, নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আরও সাড়ে তিন লাখ মানুষকে নগদ সহায়তা দেয় সরকার। ওই তালিকা সরকারের কাছে রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.