শীতকালীন সবজি চাষে ব্যস্ত হাইমচরের কৃষকরা

কবির ছন্দের মতোই অভূতপূর্ব বৈচিত্রময় শীতকাল। নৈসর্গিক রূপবদলের ছাপ দৈনন্দিন জীবনের পুরো চিত্রকে পাল্টে দেয়ার জন্যও নিচ্ছে বিপুল প্রস্তুতি। প্রকৃতিতে এখন শীতের আমেজ। বইতে শুরু করেছে উত্তুরে হাওয়া। বিকেল শেষে সন্ধ্যা হতেই আবছা কুয়াশার চাদরে ঢেকে যাচ্ছে প্রকৃতি।

ভোরের মিষ্টি আলো ধানক্ষেতের ওপর ছড়ানো শিশির কণা স্পর্শ করতেই মুক্তাদানার মতো চিক চিক করে ওঠে, হাটবাজারে টাটকা শাকসবজি,পাখির গুঞ্জন, ভোরে বৃক্ষে বৃক্ষে কুয়াশার রূপালি ফোঁটা, বৈকালিক মৃদু শীতল হাওয়া জানান দেয় ঋতুর পালাবদলে শীতের আগমনীবার্তা। এই বার্তা রবি মৌসুম শুরুর জানান দিচ্ছে। এরই মধ্যে চাঁদপুর জেলার হাইমচর উপজেলায় শীতকালীন সবজির চাষ শুরু করেছেন কৃষকরা। প্রতিবছর আগাম উৎপাদিত সবজি বাজারে বিক্রয়ে ভালো দাম পেয়ে থাকেন, তাই আগাম সবজি আবাদে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন তারা। অন্যান্য ফসলের তুলনায় শীতকালীন সবজি চাষ লাভজনক হওয়ায় কৃষকেরা এদিকেই ঝুঁকে পড়েছেন বলে জানা যায়।

শীতের শুরুতেই বাজারে বিক্রি করে বেশি টাকা আয়ের আশায় চাষিরা এখন জমিতে শীতকালীন শাকসবজির চারা বপন ও পরিচর্যার কাজ করছেন। এবারে হাইমচরের কৃষি প্রধান গ্রামগুলোতে শীতের সবজির বাম্পার ফলন হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন কৃষি সংশ্লিষ্ট সকলে। গত দুইদিন হাইমচরের কয়েকটি এলাকা সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, ভোর থেকে কৃষকরা মাঠে নানা রকম সবজি চাষ করার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। লাল শাক, মূলা শাক, পালং শাক, টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি, মূলাসহ বিভিন্ন রকমের শাকসবজি চাষে দিনভর কাজ করে যাচ্ছেন কৃষকরা।

ক্ষেত থেকে টাটকা সবজি সংগ্রহ করতে অনেকেই ক্ষেতে আসছেন। আবার অনেকেই সকালে হাঁটতে বের হয়েছেন। কেউ কেউ আবার হাঁটতে বের হয়ে ক্ষেত থেকে টাটকা সবজি কিনছেন। ফসলি জমিতে আগাম জাতের সবজি চাষ ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। আর উৎপাদিত সবজি স্থানীয় বাজারে চড়া মূল্যে বিক্রি করে কৃষকরা বেশ লাভবান হচ্ছেন। উত্তর আলগী গ্রামের কৃষক ফজল আহমেদ ও মুনসুর গাজী। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ক্ষেতে ফসল ফলাচ্ছেন।

প্রতিবেদককে তিনি জানান, প্রতিদিন তিনি তার স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে সারাদিন মাঠে কাজ করেন। শীত এলেই তারা দু’জনে মিলে চাষাবাদ করেন। এতে যা টাকা উপার্জন হয় তা দিয়ে ভালোভাবে তাদের সংসার চলে। ফজল আহমেদের মতো আরও অনেকেই হাইমচরের বিভিন্ন জমিতে চাষাবাদ করেন। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে কয়েক মাস পানিতে জমি তলিয়ে যাওয়ার কারণে সেখানে তারা চাষাবাদ করতে পারে না। বর্ষা চলে যাওয়ার পরে আবার জমি উর্বর হওয়ায় সেখানে শীতকালীন সবজির ভালো ফলন হয়। একই মাঠে দেখা হয় কৃষক আবুল বাশারের সাথে।

তিনি বলেন, আমি প্রতিবছর শীতকালীন সবজি চাষ করি। সবজি চাষের জন্য খুব বেশি জমির প্রয়োজন হয় না। তুলনামূলক মূলধনও কম লাগে। পরিশ্রমও তুলনামূলক কম। তবে রোগবালাই দমনে সবজি ক্ষেতে কীটনাশক বেশি প্রয়োগ করতে হয়। স্বল্প সময়েই সবজি বিক্রি উপযোগী হয়ে ওঠে। প্রায় দিনই বাজারে সবজি বিক্রি করা যায়। পরিবারের চাহিদাও মেটানো সম্ভব হয়। ক্ষেতে সবজি থাকা পর্যন্ত প্রত্যেক কৃষকের হাতে কমবেশি টাকা থাকে। যা অন্য ফসলের বেলায় সম্ভব না।

এছাড়া চলতি মৌসুমে সবজির দামও বেশ ভালো। চরভৈরবী এলাকার উত্তর পাড়া বগুলা গ্রামের কৃষক শাহআলম নেপাল বলেন, আমি প্রতি বছর শীতকালীন শসা, টমেটো সবজি চাষ করি এবং বাজারে ভালো দামে বিক্রি করতে পারি। এই বছর ৩ একর জমিতে শসা ও টমেটোর ক্ষেত করেছি যদি ফলন ভালো হয় তাহলে আশা করি গত বছরের তুলনায় এই বছর বেশি লাভবান হবো। পূর্বচর কৃষ্ণপুর এলাকার কৃষক রুহুল আমিন প্রতিবেদককে বলেন, পাঁচ হাজার টাকা খরচ করে লাউ শাক চাষ করেছি। শাকের ফলন খুব ভালো হয়েছে। কিছুদিন পর এই লাউ শাক বিক্রি করে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা লাভ হবে আশা করি।

উপজেলার চরপোড়ামূখী গ্রামের কৃষক হেলাল মিয়া বলেন, শীতের শুরুতে শীতকালীন সবজি বাজারে তুলতে পারলে দাম ভালো পাওয়া যায়। পাশাপাশি বাজারে চাহিদা থাকার কারণে তিনি এবছর শীতকালীন সবজি হিসেবে লাউ, শিম ও বেগুনের চাষ করেছেন। আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহরে মধ্যে এসব আগাম সবজি বাজারে বিক্রি করতে পারবেন। দেশের মোট সবজি চাহিদার বিশাল একটা অংশ চাঁদপুর ও আশেপাশের অঞ্চল থেকে যোগান হয়। হাইমচর সেখানে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। এ অঞ্চলে শুধু মাঠে নয়, চাষিদের ঘরের আঙিনায় ও বহু চাষির উঠান জুড়ে বাণিজ্যিকভাবে সবজি আবাদ ও উৎপাদন হচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর,চাঁদপুরের তথ্যমতে ২০২০-২০২১ মৌসুমে চাঁদপুরে শীতকালীন শাক-সবজির আবাদ ছিলো ৫ হাজার হেক্টর ও উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ১২ হাজার ৫শ মে.টন এবং হাইমচরের চাষাবাদ ৯ শ’ ২০ হেক্টর এবং উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ২০ হাজার ৭শ মে.টন।

এ বিষয়ে হাইমচর উপজেলা উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোঃ মনির হোসেন বলেন, এবার বৃষ্টিপাত বেশি হওয়ায় শীতকালীন শাকসবজিসহ সব রকমের ফসলের ভালো ফলন হচ্ছে। প্রান্তিক চাষিদের মাঝে শীতের শাকসবজির মানসম্পন্ন বীজ এবং সার দেওয়া হয়েছে এবং শীতকালীন আগাম জাতের এসব সবজি চাষ লাভজনক করে তুলতে আমাদের মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের কারিগরি সহায়তার পাশাপাশি নানাভাবে সহযোগিতা করছেন। আশা করি এবার গতবছরের চেয়ে বেশি আবাদ এবং উৎপাদন হবে।

হাইমচর প্রতিনিধি

Leave a Reply

Your email address will not be published.