চাঁদপুরে বিলুপ্তপ্রায় কৃষি উপকরণ দোন-সেঁউতি

 

চাঁদপুরে বিলুপ্তপ্রায় কৃষি উপকরণ দোন-সেঁউতি

চাঁদপুর সময় রিপোর্ট

 

চাঁদপুর জেলার গ্রামের সর্বত্র হারিয়ে যাচ্ছে প্রাচীন অযাত্রিক কৃষিজ যন্ত্র দোন-সেঁউতি। বিজ্ঞান-প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষতায় প্রতিটি শাখা আধুনিকায়নের ফলে যন্ত্র সভ্যতার জাঁতাকলে বিলুপ্ত এসব কৃষিজযন্ত্র।

জেলার বিভিন্ন প্রান্ত ঘুরে দেখা যায়, আগেকার দিনে জমিতে পানি সেচের ব্যবস্থা জন্য ব্যবহার করা হতো টিন বা বাঁশের তৈরি সেঁউতি ও কাঠ বা তালগাছ থেকে তৈরীকৃত দোন।

স্থানীয়রা সেঁউতিকে পানি সেচের হেইত ও দোনকে দোংগা বলে জানেন। আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি আবিষ্কারের ফলে দিন দিন হারিয়ে যেতে বসেছে সেইসব কাঠের দোন ও টিনের

সেউতিসহ অন্যান্য চিরচেনা কৃষি উপকরণ সামগ্রী।

এক সময় গ্রামবাংলার কৃষিতে সেচযন্ত্র হিসেবে টিন বা বাঁশের তৈরি সেউতি ও কাঠের দোনের ব্যাপক চাহিদা ছিল। টিন বা বাঁশের চাটাই দিয়ে তৈরি সেঁউতি দিয়ে খাল বা নিচু জমি

থেকে ওপরে পানি সিঞ্চন করা হতো। আর উঁচুনিচু জমিতে পানি সেচ দিতে সেচযন্ত্র কাঠের দোন ছিল অতুলনীয়। গ্রামবাংলার কৃষকেরা আদিকাল থেকেই চিন্তা চেতনার ফসল হিসেবে আবিষ্কার করেছিল এ কাঠের দোন। আম বা কাঁঠাল জাতীয় গাছের মাঝের অংশের কাঠ কেটে নিয়ে তার মাঝখানে ড্রেন তৈরি করে পানি সেচ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হতো। এতে করে পানি সেচ দিতে শ্রমিক ছাড়া কোনো প্রকার খরচ হয় না। তা ছাড়া এটি সহজে বহনীয়। এছাড়া অনেক এলাকায় তালগাছ দিয়েও দোন বানানো হতো।

অনেক এলাকায় তালগাছের দোনকে বর্ষাকালের বাহন হিসেবে ব্যবহার করতে দেখাগেছে।

দোনে সেচ দেওয়া খুব মজার কাজ। একটি বাঁশের শক্ত খুঁটি মাটিতে পুঁতে তার সঙ্গে লম্বা অন্য একটি বাঁশ বেঁধে দিতে হয়। এক অংশে দোনের মাথা অন্য অংশে মাটির ভরা (ওজন) তুলে দিয়ে পানিতে চুবিয়ে তুললে এক সঙ্গে অনেক পানি উঠে আসে। এ ভাবে অনবরত পানি তুললে দ্রুত সেচের কাজ হয়।

তবে এখনো চাঁদপুরের প্রত্যন্ত কিছু কিছু এলাকায় এসব কৃষি উপকরণের ব্যবহার দেখা য়ায়। তাও সীমিত আকারে ব্যবহার করেন কিছু কৃষক। আবার অনেকে শখের বসে এসব যন্ত্র

ব্যবহার করছেন বলেন জানাযায়।
সচেতন মহলের মতে, আধুনিক যন্ত্রসভ্যতা আমাদের জন্য আশীর্বাদ। কিন্তু গ্রামীণ ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক আমাদের পূর্বপুরুষের তৈরি কৃষি যন্ত্রপাতি সভ্য সমাজ ও অনাগত

জাতির চেনার জন্য চালু রাখা প্রয়োজন।

উপজেলার শাহরাস্তি মডেল স্কুলের ৮ম শ্রেণির ছাত্র মো. ফজলে নুর নেহাল বলে, আমি কখনো দোন বা সেঁউতি দেখেনি। তবে বই পড়ে জানতে পেরেছে এসব কৃষিকাজে ব্যবহার

করা হয়।

নিজমেহার গ্রামের কৃষক মো. আবু ইউসুফ (৪৫) বলেন, আমি বাপ-দাদাদের দোন ও সেঁউতি ব্যবহার করে সেচকাজ করতে দেখেছি। এ জন্য শখের বশে একটি সেঁউতি তৈরি করে

 

 

তা দিয়ে পানি সেচ দিয়েছি।
একই গ্রামের মো. আলমাছ মিয়া (৬৮) বলেন, আগে আমরা দোন-সেঁউতি দিয়েই সেচকার্য চালাতাম। এখন আধুনিক অনেক যন্ত্রপাতি আসায় এগুলো আর ব্যবহার করা হয় না।
এদিকে চাঁদপুর সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকাঘুরে এসব সেঁউতি বা দোনের দেখা মিলেনি। এজন্য চাঁদপুর সদর উপজেলার রঘুনাথপুর গ্রামের মান্নান খা জানান, সব বালু দিয়ে

ভরাট হয়ে যাচ্ছে। কৃষি জমি কমে এসেছে। যেসব এলাকায় এখনো স্কিম চালু আছে সেখানে মোটর দিয়ে পানি দেওয়া হয়। এখন আর ঐসব দোন বা সেঁউতির প্রয়োজন হয় না। সেচ

দিতে এখন আর কোন শ্রমিকের প্রয়োজন হয় না।

এদিকে জানাযায় আধুনিক যন্ত্র মানুষের কষ্ট লাঘব করলেও উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে তুলছে যে তাতে কোন সন্দেহ নেই। আগে অনেক চাষি নিজেই অযান্ত্রিক কৃষি উপকণ ব্যবহার করতেন। এতে কোন খরচ হতো না। কিন্তু এখন খরচ আর খরচ। তাই ঐসব উকরণের মাধ্যমে এখনো চাষাবাদ হলে অবশ্যই উৎপাদন খরচ কমে আসবে বলে মনেকরিছেন

বিশ্লেষকরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.