হলিউডে বাংলাদেশের মেয়ে

সনি পিকচার্সের অফিস। চোখের সামনে দিয়ে হেঁটে গেলেন ফিল লর্ড। ‘স্পাইডার–ম্যান: ইনটু দ্য স্পাইডার–ভার্স’–এর লেখক তিনি। ওই যে ক্রিস মিলার, পিটার রামজি, রোডনি রথম্যান। এই ছবির কেউ প্রযোজক, কেউ পরিচালক। একসঙ্গে তাঁদের দেখে চোখ বড় বড় হয়ে গেল আফসারা আলভীর। এ–ও সত্যি! স্পাইডার–ম্যানের পাঁড় ভক্তের সামনে স্বয়ং নির্মাতারা হাজির! হ্যালুসিনেশন না তো? নিজের গায়ে চিমটি কাটেন আলভী। না স্বপ্ন নয়, সবই বাস্তব।
‘সনি পিকচার্সে আমার ইন্টার্নশিপ শুরু হওয়ার আগে ‘স্পাইডার-ম্যান: ইনটু দ্য স্পাইডার–ভার্স’ ছবিটা ব্যাক টু ব্যাক দেখেছি তিনবার। কিন্তু কখনো কল্পনা করিনি, এই ছবির লেখক ও পরিচালকের সঙ্গে আমার দেখা হবে। সনিতে একটা ঐতিহ্য আছে। কোনো ছবি বক্স অফিসে অনেক ভালো করলে, অস্কার পেলে, তারা সেটা সব অফিস কর্মীর সঙ্গে উদ্‌যাপন করে,’ বলছিলেন আলভী, কণ্ঠে তাঁর উচ্ছ্বাস।

একটু প্রশ্ন জাগে। কে এই আফসারা আলভী? বিদেশে, বিশেষ করে হলিউডেও নিজেদের মেলে ধরার চেষ্টা করছেন এ দেশেরই কিছু তরুণ। কেউ পরিচালনায়, কেউ ভিএফএক্স, কেউ সম্পাদনায়, কেউ প্রোডাকশনে। তাঁদের মধ্যে ওয়াহিদ ইবনে রেজার কথা বলা যায়। তাঁর সূত্র ধরেই মেলে আলভীর খোঁজ।

যুক্তরাষ্ট্রে আফসারা আলভীর সঙ্গে যোগাযোগে সঙ্গী হোয়াটসঅ্যাপ। কথা ছিল খুব অল্প সময় আলাপ হবে কিন্তু তা গড়িয়ে যায় কয়েক দিনে। উঠে আসে বেড়ে ওঠা থেকে শুরু করে হলিউডে তাঁর কাজ আর স্বপ্নের নানা কথা। এমারসন কলেজ থেকে মিডিয়া আর্টস প্রোডাকশনে লেখাপড়া করা আলভী ইন্টার্নি শুরু করেছিলেন বিখ্যাত প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান সনি পিকচার্সে। কাজের শুরুটা এত বড় প্রতিষ্ঠানে হওয়ায় স্বপ্নটাও আকাশসমান বড় হয়ে যায় তাঁরর। একে একে কাজ করেছেন ‘ফাদারহুড’ আর ‘মরবিয়াস’ ছবিতে। এখন করছেন স্টারওয়ার্সের সিরিজ ওবি ওয়ান কেনবিতে। আলভী কাজ করেন পোস্ট প্রোডাকশন অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে।

কোথায় বোনা ছিল চলচ্চিত্রের বীজ? আফসারা আলভীর বক্তব্য, ‘আমার মা–বাবা সিনেমার প্রতি আমার ভালোবাসাটা তৈরি করে দিয়েছেন। ছোটবেলা থেকেই মা পাশে বসিয়ে সত্যজিৎ রায়ের ছবি দেখাতেন। গল্প বলতেন চলচ্চিত্র নিয়ে। সিনেমা হলে নিয়ে গিয়ে দেখিয়েছেন ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘দুই দুয়ারী’র মতো ছবি। মায়ের সঙ্গে বসে দেখেছি তারেক মাসুদের রানওয়ে ছবিটি। তাই ভালোবাসাটা অনেক আগেই জন্ম নিয়েছিল। কিন্তু প্যাশন যে প্রফেশনে বদলে যাবে, এটা ভাবিনি আগে।’

হলিউডে-বাংলাদেশের-মেয়ে

ক্লাস সেভেনে তখন, স্পাইডার-ম্যান–এর ছবি দেখে একেবারে মুগ্ধ আলভী। তখন থেকে সনি, মার্ভেল আর ডিজনির পাঁড় ভক্ত তিনি। শৈশবটা কেটেছে দুরন্তপনায়। যেখানে যেতেন, কোনো না কোনো ঝামেলা বাধিয়ে আসতেন। ছোটবেলায় ছিলেন কার্টুন আর অ্যানিমেশনের পোকা। স্বভাবতই শৈশবে পড়ালেখার দিকেই মনোযোগ দিতে চাপ দেওয়া হয়। কিন্তু আলভির সৃজনশীলতা আর পড়ালেখা চলছিল সমান্তরালে। আলভি স্মৃতিচারণা করেন এইচএসসির সময়কার। ‘এইচএসসির ফলাফলের দিন দরজা বন্ধ করে বসে আছি। ভাবছি পাস করব না ফেল। কিন্তু কিছুক্ষণ পর দেখি মুঠোফোনে টেক্সট আসে, “তোমার লেখাটা অনেক সুন্দর হয়েছে।” অনেকেই অভিনন্দন জানাচ্ছে। আমার একটা ছোট লেখা ছাপা হয়েছিল প্রথম আলোর নারীমঞ্চ পাতায়। সেটা নিয়েই সবাই অভিনন্দন জানাচ্ছেন। ওদিকে রেজাল্ট পাইনি। কী করব। বের হয়ে মাকে বলব? কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না।’

সৃজনশীলতার জন্য সেই অভিনন্দন আলভীকে একদিন সনি পিকচার্সের অফিসে নিয়ে ফেলবে, কে জানত! কাজ করে যাচ্ছেন হরদম। স্বপ্ন একদিন মস্ত সম্পাদক হবেন। স্পাইডার-ম্যান–সিরিজের ছবি সম্পাদনা করবেন আলভী। কাজের বাইরে টুকটাক লেখালেখি চলে। পকেটে একটা স্কেচবুক আর নোটবুক থাকে সব সময়। সময় পেলেই তাতে চলে আঁকিবুঁকি। ছুটিতে হাইকিং আর ঘুরতে যাওয়াই শখ।
খুলনায় জন্ম আফসারা আলভীর শৈশব কেটেছে নানুবাড়িতে। তারপর ২০১৩ সালে পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। শৈশবে খুলনার স্মৃতি আলভীকে যেমন সুখী করে, তেমনি দুঃখও দেয়। খুলনার পানিবন্দী মানুষের জন্য কাজ করছেন আলভী। উপকূল এলাকায় সুবিধাবঞ্চিত মানুষের উন্নয়নে নিজে গড়েছেন কান্ডারি নামে একটি সংগঠন। এখানে তরুণেরা কাজ করছেন শিক্ষার উন্নয়ন নিয়ে। আলভীর স্বপ্ন, তরুণেরাই একদিন কান্ডারি হবেন, হোক তা সমাজের কিংবা চলচ্চিত্রের।

Leave a Reply

Your email address will not be published.