হাইমচরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি : মতলবে কৃষকের কান্না

ঘূর্ণিঝড় জাওয়াদের প্রভাবে বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে ফের মাথায় হাত পড়ল হাইমচরের কৃষকদের। টানা তিনদিনের বৃষ্টি ও বৈরি আবহাওয়ায় সবজির মাঠে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। নষ্ট হয়েছে পাকা আমন ধান, বোরো বীজতলা, আলু, ফুলকপি, বাঁধাকপি, মুলা, পেঁয়াজ, শসাসহ শীতকালীন ফসল।

৭ ডিসেম্বর ২০২১ মঙ্গলবার হাইমচরের চরভাঙ্গার কৃষক মাহমুদউল্লাহ গাজী বিডি সমাচার কে জানান, টানা বৃষ্টিতে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে বাঁধাকপি, ফুলকপি, সিম, পাকা আমন ধান, বোরো বীজতলা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
গত তিনদিনের বারিবর্ষণে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন সাধারণ কৃষকরা। কৃষকরা জানান, আলু, গম, বোরোর বীজতলা, সরিষাসহ শীতকালীন ফসলের ক্ষেতে পানি জমে গেছে। পানি না সরলে এসব ফসল নষ্ট হয়ে যাবে।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায় গত তিন দিনের টানা বারিবর্ষণে হাইমচরে সরিষা ৫০ হেক্টর, মরিচ ৪০ হেক্টর, পেয়াজ ৫০ হেক্টর, রসুন ২০ হেক্টর, মসুর ডাল ৫০ হেক্টর, খেসারী ৩০ হেক্টর, শাকসবজি ১৯৫ হেক্টর জমি বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ দেবব্রত সরকার বিডি সমাচার কে বলেন, আমরা আমাদের উপসহকারী কৃষি অফিসারের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা তৈরি করে আগামীতে কৃষি প্রণোদনা বৃদ্ধি বা পুনর্বাসনের মাধ্যমে তাদের ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবো। আর ইতোমধ্যে কৃষকের পাশে থেকে মাঠ পর্যায়ে কাজ করার জন্য উপসহকারী কৃষি অফিসারদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

তিনি জানান, এবার হাইমচরে আমন ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৪০৫ হেক্টর জমিতে। আবাদ হয়েছে ১৪২০ হেক্টর জমিতে। ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন।

এদিকে টানা বৃষ্টিতে হাইমচরের উত্তর ও দক্ষিণ ইউনিয়নে অধিকাংশ এলাকার মৎস্য ঘের তলিয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অপেক্ষাকৃত নিচু এলাকার বোরো বীজতলা। অনেক এলাকার রাস্তা-ঘাট, বাড়ি-ঘর, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ নিম্নাঞ্চল পানিতে তলিয়ে গেছে।

অসময়ের টানা বৃষ্টিতে অধিকাংশ ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। বিশেষ করে আলু চাষিদের ব্যপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। আলু অতি লাভজনক হওয়ার কারণে এবছর অনেকেই আলু চাষের দিকে ঝুঁকেছেন।

কিন্তু গত তিন দিনের অতিবৃষ্টিতে আলুর ফসলি মাঠে পানি জমে গেছে। ফলে যেসব জমিতে পানি জমেছে ঐসব জমির আলু হবে না। আলুর উৎপাদন কিছুটা হলেও দ্রুত পচন ধরবে বলে মনে করছেন চাষিরা।

ফসলি জমির ব্যপক ক্ষয়ক্ষতির কারণে হাইমচরের কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছে। মাঠকে মাঠ ফসলি জমি এখন পানির নিচে রয়েছে। এর মধ্যে যেসব ফসল এখনই ঘরে তোলার সময় হয়েছে সেইসব ফসলও ক্ষতির মধ্যে পড়েছে। ফলে আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে কৃষকদেরকে।

চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলায় অসময়ের বৃষ্টিতে ফসলের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন চাষিরা। সাগরে নিম্নচাপ জাওয়াদের প্রভাবে গত শনিবার থেকে মতলব দক্ষিণসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে। এতে উপজেলার আমন, আলু, পেঁয়াজ, সরিষাসহ শীতকালীন শাকসবজি নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা।

বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সাধারণত অগ্রহায়ণ মাসের শেষের দিকে কৃষকেরা মাঠে ধান কেটে ঘরে তোলেন। এ সময়ে টানা বৃষ্টিপাতে ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকেরা। অনেক এলাকায় আমন মৌসুমের পাকা ধান কাটা হয়নি। কিছু এলাকায় কেউ মাড়াই দিয়ে ধান বের করেছেন, কেউ মাড়াই দেওয়ার অপেক্ষায় আছেন। বৃষ্টির কারণে পাকা ধান মাটির সঙ্গে মিশে যাবে। এ ছাড়া ধানগাছের খড় নষ্ট হয়ে পশুর খাবার সংকট হবে বলে জানান কৃষকেরা।

এদিকে জেলার মতলব দক্ষিণ, হাজীগঞ্জ, মতলব উত্তর ও ফরিদগঞ্জ বেড়িবাঁধ এলাকায় আবাদ করা শীতকালীন শাকসবজির ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

মিজান শেখ, মনির হোসেনসহ কয়েকজন কৃষক বলেন, এখন আমন ফসল ঘরে তোলার সময়। এ সময় বৃষ্টিতে ধানগাছ মাটিতে পড়ে গেছে। বৃষ্টির পানির সঙ্গে গাছ থেকে ধান ঝরে পড়ছে। তা ছাড়া নিচু জমিতে পানি জমায় ধান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের কৃষক মাহবুব বলেন, ‘টানা বৃষ্টিতে আমার রোপণ করা আলুর বেশি ক্ষতি হচ্ছে। এ ছাড়া টমেটো, সরিষা, পেঁয়াজ, করলা, বরবটি, ফুলকপি, বাঁধাকপি, লালশাক, লাউসহ শীতকালীন শাকসবজির ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বারবার ফসল ও সবজিখেতের ক্ষতি হওয়ায় সবাই দুশ্চিন্তার মধ্যে আছি।’

ইরি-বোরোর বীজতলা তৈরি করা কৃষকেরা বলেন, বৃষ্টি আরও কয়েক দিন থাকলে তাঁদের বীজতলা নষ্ট হয়ে যাবে। নতুন করে আবার হয়তো বীজতলা তৈরি করতে হবে। এতে খরচ দ্বিগুণ হবে। বীজ সংগ্রহ করতে সমস্যা হয়ে পড়বে।

চাঁদপুর আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা যায়, নিম্নচাপের কারণে ৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তারপর আবহাওয়া স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলেও মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাবে। গত ৩৩ ঘন্টায় চাঁদপুরে ৭৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

চাঁদপুর জেলা কৃষি অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, বৈরী আবহাওয়ার কারণে কৃষকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কাটা ধান, আলুসহ শাকসবজির ক্ষতি হচ্ছে। তবে বৃষ্টিপাত বন্ধ না হওয়ায় এখনো ক্ষয়ক্ষতি পুরোপুরি নিরূপণ করা সম্ভব হচ্ছে না।

স্টাফ করেসপন্ডেট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *