হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যের হালখাতা

ফরিদুল ইসলাম বাঙলা নবর্ষ উদযাপন আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির একটি অংশ। তবে সাম্প্রতিককালে বাঙ্গালী সংস্কৃতিতে হানা দিয়েছে পশ্চিমা সংস্কৃতি। তবুও বাঙালীরা এই দিবসে এক অন্যরকম মুহুর্ত হিসেবে দারুন উপভোগ করে। ‘মুছে যাক গ্লানি ঘুচে যাক জরা, অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা’ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো করে এভাবে না ভাবলেও নতুন বছরে পুরনো দিনের হিসাব শেষ করতে চান ব্যবসায়ীরা।
গত বছরের সব দেনাপাওনা মিটিয়ে নতুন বছর থেকে হিসাবের নতুন খাতা খোলেন তারা। পুরনো হিসাবের খাতা বন্ধ ও নতুন খাতা খোলার আনন্দ-আয়োজন, আপ্যায়ন ও আনুষ্ঠানিকতার নামই হালখাতা। বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। বাঙালির ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে আছে পহেলা বৈশাখসহ সার্বজনীন সকল উৎসব।
বৈশাখবরণে বাঙালির আয়োজনের কোনো কমতি নেই। তবে নববর্ষকে সামনে রেখে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য হালখাতা প্রথাটি আগের মতো চোখে পড়েনা। কালের বিবর্তনে, কালের গর্ভে হারাচ্ছে বাঙালির প্রাণের এ উৎসব। বৈশাখের প্রথম দিন গ্রামবাংলা, শহরে, ছোট-মাঝারি-বৃহৎ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হালখাতার আয়োজন করা হতো।
এ উপলক্ষে ছাপানো হতো নিমন্ত্রণপত্র, চলতো নানা আয়োজন, উৎসব উদ্দীপনার মধ্যে অনুষ্ঠিত হতো হালখাতা উৎসব। গ্রামের হালখাতাতে ব্যবসায়ীরা বৈশাখের প্রথম দিনে সকালে এসে দোকান পরিস্কার করে কাগজের ফুল দিয়ে বর্ণিল সাজে সাজাতো। ক্রেতাকে আপ্যায়ন করতো জিলাপি, খাজা, দই চিড়া ও মুড়ি দিয়ে।
আর শহরের ব্যবসায়ীরা হালখাতার দিনে নানা রঙয়ের আলোকসজ্জার মাধ্যমে দোকানকে বর্ণিল সাজে সাজাতো। আর খরিদ্দারকে আপ্যায়ন করার জন্য মিষ্টান্ন, পোলাও মাংস ব্যবস্থা রাখতো। বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্যর এই প্রাণের হালখাতা উৎসব যেন আজ আধুনিক যুগের অনলাইন ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং, ক্রেডিট কার্ড আর ডেবিট কার্ড এর মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তির পৃথিবীর কাছে এখন হারানোর পথে।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, মোগল সম্রাট আকবরের সময়কাল থেকেই পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু হয়। আর এর সঙ্গে শুরু হয় বাংলা সনের প্রথম দিনে দোকানপাটের হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে হালনাগাদ করার প্রক্রিয়া। মোগল আমল থেকেই পয়লা বৈশাখে অনুষ্ঠান করা হতো। প্রজারা চৈত্র মাসের শেষ পর্যন্ত খাজনা পরিশোধ করতেন এবং পয়লা বৈশাখে জমিদাররা প্রজাদের মিষ্টি মুখ করানোর পাশাপাশি আনন্দ উৎসব করতেন। এ ছাড়া ব্যবসায়ী ও দোকানদার পহেলা বৈশাখে হালখাতা করতেন।
এ বিষয়ে কয়েকজন প্রবীণ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, আগে হালখাতা উৎসব অন্যরকম একটা আনন্দ ছিলো। ব্যাপক পরিসরে উৎসব আনন্দে হালখাতা পালন করা হতো। কিন্ত বর্তমানে চাকরিজীবী থেকে শুরু করে ব্যবসায়ীরা প্রায় সবাই ইংরেজী মাসের ওপর ভিত্তি করে আয় ব্যয় করেন। নগদ বিক্রি অথবা বাকি লেনদেন সবই হয় ইংরেজী মাসের ওপর ভিত্তি করে। তাই ধীরে ধীরে পহেলা বৈশাখে হালখাতা উৎসব হারিয়ে যাচ্ছে।
তারা বলছেন, ব্যবসাই যদি না থাকে তবে আনন্দ থাকবে কোত্থেকে। বিশ্ববাজারে মন্দায় লোকসান দিতে হচ্ছে। ফলে নতুন বছর শুরু হবে মনে কষ্ট নিয়েই।
খাতুনগঞ্জ চাক্তাই আড়তদার ব্যবসায়ী সমিতি সাধারণ সম্পাদক মো. মহিউদ্দিন বাংলানিউজকে বলেন, ‘একসময় খাতুনগঞ্জে হালখাতা অনুষ্ঠানে উৎসাহ উদ্দীপনা ছিল। ফুলে ফুলে সাজিয়ে তুলতো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। মিষ্টিমুখ করানো হতো সবাইকে। কিন্তু আগের সেই জৌলুস নেই। তবুও কেউ কেউ পুরনো ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।
যে কারণে জৌলুস হারাচ্ছে
আগে হালখাতা উৎসবে অন্যরকম একটা আনন্দ ছিলো। ব্যাপক পরিসরে হালখাতার অনুষ্ঠান আয়োজন করা হতো। কিন্ত বর্তমানে চাকরিজীবী থেকে শুরু করে ব্যবসায়ীরা প্রায় সবাই ইংরেজি মাসের ওপর ভিত্তি করে আয়-ব্যয় করেন। নগদ বিক্রি অথবা বাকি লেনদেন সবই হয় ইংরেজি মাসের ওপর ভিত্তি করে। তাই ধীরে ধীরে পহেলা বৈশাখে হালখাতা উৎসব হারিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া এখন কম্পিউটার বা মোবাইলের মাধ্যমে পণ্য বেচাকেনার হিসাব রাখা হচ্ছে।
অতীতে জমিদারকে খাজনা দেওয়ার অনুষ্ঠান হিসেবে ‘পুণ্যাহ’ প্রচলিত ছিল। বছরের প্রথম দিন প্রজারা ভালো পোশাক পরে জমিদার বাড়িতে গিয়ে খাজনা পরিশোধ করতেন। তাদের মিষ্টি দিয়ে আপ্যায়ন করা হতো। জমিদারী প্রথা উঠে যাওয়ায় পুণ্যাহ বিলুপ্ত হয়েছে।
এ প্রথার অনেকটা অনুকরণ দেখা যায় হালখাতায়। ধার-বাকির পুরনো খাতা ছেড়ে, হিসেব চলে যায় হালের খাতায়। বর্তমান সনের নতুন হিসেবের খাতা বাঙালি সংস্কৃতির ধারকমুদ্রা। শুধু হিসেব তো নয়, এটা আসলে বিক্রেতা-ক্রেতার পারস্পরিক সম্পর্ক রক্ষার বিষয়। আর তাই ক্রেতাদের মন তুষ্ট করতে এখনও দোকানদারদের চেষ্টার কমতি নেই। আজ শপিংমল, অনলাইন শপিংয়ের যুগে হালখাতার রঙ অনেকটাই ফিকে। তবুও প্রতি পয়লা বৈশাখে পাড়ার দোকান সেজে ওঠে, নতুন খাতার কপালে পড়ে সিঁদুরের ফোঁটা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.